১৬ জানুয়ারি সারাদেশে বিএনপির বিক্ষোভ

0
52

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর গণঅবস্থান কমসূচি থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। দলগুলো ১০ দফা দাবি আদায়ে ও বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবিতে আগামী ১৬ জানুয়ারি সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে। এর অংশ হিসেবে ঢাকাসহ দেশের সব মহানগর, জেলা, উপজেলা ও পৌর সদরে সমাবেশ ও মিছিল কর্মসূচি পালন করা হবে।

গতকাল বুধবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ১০ ‘বিভাগীয়’ সদরে একযোগে টানা চার ঘণ্টার যুগপৎ আন্দোলনের দ্বিতীয় দফার গণঅবস্থান কর্মসূচি থেকে দলগুলোর নেতারা নতুন কর্মসূচি দেন। বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, দলটির দশটি সাংগঠনিক বিভাগীয় শহরে এ গণঅবস্থান কর্মসূচিতে ৮২ সাংগঠনিক জেলা ও মহানগর নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

নয়াপল্টনে বিএনপি, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গণতন্ত্র মঞ্চ, জাতীয় প্রেসক্লাবের পূর্ব প্রান্তে গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, আরামবাগের ইডেন কমপ্লেক্সে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মোস্তফা মহসিন মন্টু নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, বিজয়নগরে পানির ট্যাংকের কাছ থেকে ১২-দলীয় জোট, পুরানা পল্টনে প্রতীম হোটেলের কাছ থেকে সমমনা জাতীয়তাবাদী জোট ও কাওরানবাজারে এফডিসির কাছে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এলডিপি আলাদা আলাদাভাবে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

নয়াপল্টনে গণঅবস্থান কর্মসূচি থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আগামী ১৬ জানুয়ারি ১০ দফা দাবি আদায় ও বিদ্যুতের মূল্য কমানোর দাবিতে কেন্দ্রসহ দেশের সব মহানগর জেলা উপজেলা পৌর সদরে সমাবেশ ও মিছিল হবে। এ সময় নেতাকর্মীরা তুমুল করতালি দিয়ে এ কর্মসূচিকে সমর্থন জানায়।

সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ১০ দফা দাবিতে বিএনপিসহ সমমনা দল এবং জোট গত ২৪ ডিসেম্বর ৯টি বিভাগীয় শহরে, ঢাকায় ৩০ ডিসেম্বর গণমিছিল কর্মসূচির মধ্য দিয়ে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। গতকালের অনুষ্ঠিত গণঅবস্থান কর্মসূচি হচ্ছে যুগপৎ আন্দোলনের দ্বিতীয় কর্মসূচি।

কর্মসূচি সুশৃঙ্খলভাবে করতে নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত সড়কের একপাশে ১৭ স্থান নির্ধারণ করে বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়। দলের সিদ্ধান্ত মেনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সিনিয়র নেতারা অবস্থান নেন। ফকিরাপুল মোড়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ, নাইটিঙ্গেল মোড়ে ঢাকা মহানগর উত্তর, সিটি হার্টের সামনে ঢাকা জেলা অবস্থান নেয়। নয়াপল্টন থানার বিপরীতে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর এবং নরসিংদী জেলা অবস্থান নেয়।

ঢাকা ব্যাংকের সামনে মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলা, গাজীপুর জেলা ও মহানগর এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা অবস্থান নেয়। হক বে থেকে পুবালী ব্যাংকের সামনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, পুবালী ব্যাংকের সামনে যুবদল, হক বে’র সামনে স্বেচ্ছাসেবক দল অবস্থান নেয়। আনন্দ ভবনের সামনে কৃষক দল ও পূবালী ব্যাংকের সামনে মহিলা দল এবং হোটেল ভিক্টোরীর সামনে মুক্তিযোদ্ধা দল ও পেশাজীবী সংগঠন অবস্থান নেয়। চায়না মার্কেটের সামনে জাসাস, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে মৎস্যজীবী দল, মসজিদের সামনে শ্রমিক দল, ওলামা দল, তাঁতি দল অবস্থান নেয়।

গণঅবস্থান কর্মসূচির জন্য দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ছোট মঞ্চ তৈরি করা হয়। নেতাকর্মীদের বসার জন্য সড়কে ত্রিপল, পলিথিন, ফুটপাতে কিছু চেয়ার বসানো হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মসূচি শুরু হলেও এর আগে থেকেই মিছিল নিয়ে নয়াপল্টনে নির্ধারিত স্থানে জমায়েত হতে থাকেন নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে মঞ্চ থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, যেহেতু নির্ধারিত স্থানে বসার আর জায়গা নেই, এ অবস্থায় যে যেখানে পারেন বসে যান। সামনে এগোবেন না। দেখা গেছে, মূল সড়ক ছাড়িয়ে আশপাশের গলিতেও নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন।

এ কর্মসূচি ঘিরে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেশ সতর্ক ছিল। কাকরাইল ও ফকিরাপুল মোড়ে জলকামান নিয়ে পুলিশ সদস্যরা অবস্থান নেয়। এ ছাড়া আশপাশের সড়কের মোড়ে মোড়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেয়। কোনো ধরনের অশান্তি ছাড়াই শেষ পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি শেষ হয়।

গণঅবস্থান কর্মসূচি থেকে সরকার পতন আন্দোলনে জনগণকে জেগে ওঠার ডাক দেন মির্জা ফখরুল। এ সময় তিনি ফরিদপুর ও ময়মনসিংহের গণঅবস্থানের কর্মসূচিতে পুলিশ ও সরকারি দলের হামলার নিন্দা জানান। একই সঙ্গে কারাবন্দি বিএনপি নেতা আবদুস সালাম, রুহুল কবির রিজভী, খায়রুল কবির খোকন, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ফজলুল হক মিলন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, এবিএম মোশাররফ হোসেন, খন্দকার আবু আশফাক, আবুল হোসেন, সেলিম রেজা হাবিব, যুবদলের সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, তাঁতি দলের আবুল কালাম আজাদ, ওলামা দলের শাহ নেছারুল হক, মৎস্যজীবী দলের রফিকুল ইসলাম মাহতাবসহ বন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করেন মির্জা ফখরুল।

নয়াপল্টনে গণঅবস্থান কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে একটিই চ্যালেঞ্জ, এ সরকারকে বিদায় করতে হবে। গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাতে হবে। এ সরকার শুধু বাংলাদেশের জনগণের কাছে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও ধিকৃত।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে স্থায়ী কমিটির সদ্য কারামুক্ত সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমরা টোকা দিয়ে নয়, ধাক্কা দিয়ে নয়, একটা সঠিক সাচ্চা ভালো নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাতে চাই। আমরা শান্তিপূর্ণ মিছিল-মিটিং, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে এ সরকারের পতন ঘটাতে চাই। কোনো উচ্ছৃঙ্খলতায় বিশ্বাস করি না। দয়া করে কোনো উসকানি দেবেন না। যদি কোনো উসকানি দেন এর ফলে কিন্তু ভালো হবে না।’

ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, ঢাকা মহানগরের সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু ও উত্তরের আমিনুল হকের পরিচালনায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমান, আফরোজা খানম রীতা, মীর সরাফত আলী সপু, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, যুবদলের মামুন হাসান, মোনায়েম মুন্না, স্বেচ্ছাসেবক দলের এসএম জিলানী, কৃষক দলের হাসান জাফির তুহিন, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক আহমেদ খান, শ্রমিক দলের মোস্তাফিজুল করীম মজুমদার, মৎস্যজীবী দলের আবদুর রহিম, তাঁতি দলের কাজী মুনীরুজ্জামান মুনীর, জাসাসের জাকির হোসেন রোকন, ওলামা দলের মাওলনা আবুল হোসেন, ছাত্রদলের কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাইফ মাহমুদ জুয়েল, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের কাদের গনি চৌধুরী, জিয়া পরিষদের আব্দুল কুদ্দুস, ড্যাবের আবদুস সালাম, অ্যাবের রিয়াজুল ইসলাম রিজু প্রমুখ।

গণতন্ত্র মঞ্চ : জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে গণতন্ত্র মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি দুপুর ১২টায় শুরু হয়। তবে এ কর্মসূচিতে অংশ নেননি নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব এবং গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ূমের সভাপতিত্বে এবং সাংগঠনিক সমন্বয়ক ইমরান ইমনের পরিচালনায় গণঅবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু প্রমুখ। গণঅবস্থান কর্মসূচি থেকে আগামী ১৬ জানুয়ারি কারওয়ানবাজারে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সামনে অবস্থান এবং বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চ। জানা গেছে, অসুস্থতার কারণে মান্না আসতে পারেননি।

১২-দলীয় জোট : বেলা ১১টা বিজয়নগরে পানির ট্যাঙ্কির উত্তর পাশের সড়কে সোয়া ১টা পর্যন্ত ১২-দলীয় জোট গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এ কর্মসূচিতে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি (জাফর), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় দল, এনডিপি, বাংলাদেশ এলডিপি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল ও বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টির শীর্ষ নেতারা। দুপুর ১টার দিকে জোটের মুখপাত্র সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম যখন বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন, তখন দক্ষিণ পাশের সড়ক হয়ে যানচলাচল শুরু হয়। এ অবস্থায় তিনি আরও ১০ মিনিট সময় দিতে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানান। কিন্তু পুলিশ তার অনুরোধ আমলে নেয়নি।

এলডিপি : রাজধানীর পূর্ব পান্থপথস্থ এফডিসিসংলগ্ন এলডিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এলডিপি গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করে বেলা ১১টায় শুরু হয়ে বিকাল ৩টায় শেষ হয় এ গণঅবস্থান কর্মসূচি। এতে বক্তব্য দেন দলের মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমদ, কেন্দ্রীয় নেতা নিয়ামুল বশির, এসএম মোরশেদ প্রমুখ।

জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট : ১২ দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট বিজয়নগরে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন জোটের সমন্বয়ক ও এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। আরও অংশ নেন জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, এসএম শাহাদাত, ডিএলের সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি, ন্যাপ ভাসানীর অ্যাডভোকেট আজহারুল ইসলাম, এনপিপির মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা, ফরিদ উদ্দিন, বিকল্প ধারা বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি প্রমুখ।

গণফোরামের একাংশ : আরামবাগে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মোস্তফা মহসিন মন্টুর গণফোরাম গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এগারোটা থেকে ২টা পর্যন্ত মন্টুর সভাপতিত্বে আরও অংশ নেন দলের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি জগলুল হায়দার আফ্রিক, সভাপতি পরিষদের সদস্য মহিউদ্দিন আবদুল কাদের প্রমুখ।

ছিল না জামায়াত : বিএনপি ও সমমনা দলগুলো যুগপৎ গণঅবস্থান কর্মসূিচ করলেও গতকাল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ছিল না। এ কর্মসূচিতে অংশ না নিয়ে জামায়াত ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করে। এ উপলক্ষে ঢাকাসহ বিভাগীয় পর্যায়ে আলোচনাসভাও করে দলটি। ঢাকা মহানগরী উত্তরের কর্মসূচিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির মুজিবুর রহমান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত জামায়াতের আন্দোলন চলবে। যারা গণতন্ত্র মানতে চায় না, তাদের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করবে জামায়াত।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও মহানগরী সেক্রেটারি রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় ভার্চুয়াল আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দিন মোল্লা ও ফখরুদ্দিন মানিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here