লাপাত্তা শতাধিক ইভিএম, নেই পর্যাপ্ত সংরক্ষণ

0
28
ছবি: সংগৃহীত

সারাবেলা ডেস্ক: হদিস নেই শতাধিক ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম)। আগুনে পুড়ে এবং চুরি হয়েছে ১২০টির মতো ইভিএম।

এ তথ্য গণমাধ্যমে জানিয়েছেন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ রাকিবুল হাসান।

তবে প্রকৃতপক্ষে নষ্ট ও হারিয়ে যাওয়া ইভিএমের সংখ্যা আরও বেশি বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একাধিক কর্মকর্তারা। এমনকি জেলাপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা ইভিএমে ব্যবহৃত মনিটর নিজ বাসায় ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা যায়, বিদায়ী কমিশনের সর্বশেষ ৯৩তম সভায় ইভিএম প্রকল্প থেকেই এ সংক্রান্ত তিন ধরনের জটিলতার তথ্য তুলে ধরা হয়। ওই সভায় জানানো হয়, ইভিএম সরঞ্জাম যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণ না করার ফলে অডিট কার্ড ব্লক হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অডিট ও পোলিং কার্ড নষ্ট হয়ে গেছে। কখনো হারিয়ে গেছে।

বর্তমানে ইভিএম প্রকল্পে মাত্র ১৩ জন লোকবল বরাদ্দ। অথচ ইভিএমগুলো কেনা হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকায়। তাই পরিকল্পনা ছাড়াই তাড়াহুড়া করে কেনায় দেড় লাখ ইভিএম নিয়ে বিপাকে পড়েছে ইসি।

ইভিএম রাখার জন্য কোথায়ও নির্ধারিত স্থান পাওয়া যায়নি। ইভিএম সংরক্ষণের জন্য গুদাম ভাড়ার প্রস্তাবে বিদায়ী কে এম নুরুল হুদা কমিশন মতপার্থক্য এবং দেশের অর্ধেক জেলায় সরকার নির্ধারিত হারে গুদাম পাওয়া যায়নি। এ কারণে একটির ওপর আরেকটি ইভিএম রাখায় অনেক নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু কতগুলো নষ্ট হয়েছে তা পরীক্ষা করে এখনো বের করেনি ইসি।

ইভিএমের জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব ও ইভিএম কারিগরি কমিটির সভাপতি অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, সংরক্ষণের মতো স্থান না থাকায় দেড় লাখ ইভিএমের মধ্যে ৮৫ হাজারের বেশি এখনো বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে (বিএমটিএফ) পড়ে আছে। তাই এ মুহূর্তে ইভিএম নিয়ে সবচেয়ে বড় জটিলতা হচ্ছে সংরক্ষণের বিষয়টি। ইভিএম কেনার সময়ে সংরক্ষণের বিষয়টি চিন্তা করা হয়নি। তাই এ অবস্থা।

জানা যায়, গত একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিদায়ী নুরুল হুদা কমিশন মাত্র ৬টি সংসদীয় আসনে ইভিএম ব্যবহার করলেও এর আগে বিএমটিএফের কাছে থেকে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা করে ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম কেনা হয়।

এ বিষয়ে ইভিএম প্রকল্প পরিচালক রাকিবুল হাসান বলেন, কয়েকদিন আগে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে কিছু ইভিএম নষ্ট হয়েছে। যেখানে ইভিএমগুলো রাখা হয়েছিল সেই গোডাউনে আগুন লেগে যায়। নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ফায়ার বিগ্রেড পানি দেয়। যেহেতু এটা ইলেকট্রনিক মেশিন তাই পানিতে তা নষ্ট হয়। সেখানে ২০০ ইভিএম রাখা হয়েছিল ৫০ থেকে ৭০টির মতো নষ্ট হয়েছে।

তিনি বলেন, এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ইভিএম চুরির ঘটনা ঘটেছে। উপজেলা অডিটরিয়ামের স্টোররুমে ইভিএম রাখা ছিল। সেখান থেকে মনিটর চুরি হয়েছে। এছাড়া ঝিনাইদহ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের একই জাগায় রাখা ছিল কিছু ইভিএম ও প্রাথমিকের বই। প্রাথমিকের বইয়ের সঙ্গে ইভিএমের মনিটর ও ব্যাটারি চুরি হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির কয়েকজন কর্মকর্তা জনান, সংরক্ষণের স্থান না থাকায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার্ভার স্টেশনগুলোতে একটার ওপর আরেকটা ইভিএম রাখা হয়েছে। এতে ভারের চাপে অনেক ইভিএমের মনিটর ও ব্যালট ইউনিট নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া অনেকে কম্পিউটার মনিটর হিসেবে ব্যবহার করছেন। জেলা-উপজেলার কয়েকজন কর্মকর্তা সেগুলো মনিটর হিসেবে ব্যবহার করছেন।

জানা গেছে, কেএম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন বিদায় মুহূর্তে ২৬টি জেলায় ইভিএম সংরক্ষণ স্থান ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে আর্থিক অনুমোদন চেয়েছিল ইসি সচিবালয়। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ২৬টি জেলায় গুদাম পাওয়া গেছে। যেগুলোর ভাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত হারের সমান অথবা কম। জেলাভেদে তিন হাজার বর্গফুট থেকে নয় হাজার ৬৬৮ বর্গফুট আয়তনের গুদাম ভাড়ার জন্য চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ মাসে এক কোটি তিন লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়।

তবে এ টাকা বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুজন নির্বাচন কমিশনার ভিন্নমত দেন। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী তার মতামতে বলেন, ইভিএম ভাড়ার জন্য যে পরিমাণ টাকা ব্যয় করার প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা সম্ভব। অপরদিকে, নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম তার মতামতে বলেন, কারিগরি দিক খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেন। ফলে বিষয়টি সেখানেই আটকে যায়। এখনো এর সুরাহা হয়নি।

এ বিষয়ে রাকিবুল হাসান বলেন, ইসি এ বিষয়ে কনসার্ন। এটাকে ভালো রাখার জন্য তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। ৩০টি জেলায় বাসা-বাড়িতে রাখা হচ্ছে। এসব জেলায় ঝুঁকি নিয়েই রাখা হচ্ছে। অনুমান করা যায়, বর্তমানে যে ইভিএম রয়েছে তা দিয়ে ৭০ থেকে ৮০ টি আসনে ভোট করা সম্ভব।

প্রায় ৯০ হাজার ইভিএমের কোয়ালিটি কন্ট্রোল করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, লাখ খানেকের ওপরে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া যেসব ইভিএমে ত্রুটি আছে সেগুলো মেরামত করতে হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ ইভিএম কেনার প্রকল্প নেয় কে এম নুরুল হুদা কমিশন। ২০১৮ সালের জুনে নেওয়া ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে। এছাড়া প্রকল্পের বাইরে আরও দুই হাজার ৫৩৫টি ইভিএম কিনেছিল ইসি। কিন্তু এখন নতুন করে ইভিএম কিনতে হলে আবার টাকা বরাদ্দ নিতে হবে।

 

আজ সারাবেলা/সংবাদ/জাই/জাতীয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here