শোষণহীন সমাজের প্রতিচ্ছবি বঙ্গবন্ধু

0
162

সারাবেলা ডেস্ক: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর

উপনিবেশিক, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, গোত্রীয় ও ব্যক্তিকর্তৃক নানাভাবে এদেশের মানুষ নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। পালবংশ, সেনবংশ, মুগল ও ব্রিটিশরা এদেশের মানুষকে বিভিন্নভাবে শোষণ ও বঞ্চিত করেছে। এসব নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুগে যুগে বিভিন্ন নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ আন্দোলন সংগ্রাম ও আত্নত্যাগের মাধ্যমে তাঁদের অধিকার আদায় করেছেন। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্তির একটি অংশ হিসাবে ধর্মের উপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত বঙ্গ প্রদেশ ভারত এবং পাকিস্তানের অংশ হিসাবে বিভক্ত হয়। প্রধানত হিন্দু অধ্যুষিত “পশ্চিম বঙ্গ” ভারত এবং মুসলিম অধ্যুষিত “পূর্ব বঙ্গ” পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়। ৩ জুন মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা অনুসারে ১৯৪৭ সালের ১৪ এবং ১৫ অগাস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান এবং ভারতের নিকট এই নতুনভাবে বিভক্ত বাংলা প্রদেশের ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের পর বাঙালি-অবাঙালি ইস্যুতে নতুন করে শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) উপর পশ্চিম পাকিস্তানের নির্যাতন ও নিপীড়ন।

পশ্চিম পাকিস্তানের নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনায় মানুষ যখন দিশেহারা ঠিক তখনই এদেশের মানুষের মুক্তিদাতা হিসাবে ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ জন্ম নেন খোকা। গোপালগঞ্জ জেলার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া সেই ছোট্ট খোকাই হয়ে ওঠেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, শোষণহীন সমাজ কায়েম করার জন্য।

নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু যে আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন তা বাঙালি জাতির ইতিহাস থেকে দিবালোকের মত স্পষ্ট। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন অর্থাৎ ১৪ বছর কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন এবং বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। ১৯৩৯ সালে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় প্রথম কারাবরণ করেন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন উর্দুকে পাকিস্থানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু তার তৎক্ষনিক প্রতিবাদ করেন। একই বছরের ২ মার্চ, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং ১১ মার্চ, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে সাধারণ ধর্মঘট আহবানকালে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। ১৯৪৮ এর ১১ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য তিনি আবারও গ্রেফতার হন। ১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা তাদের দাবী দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে ধর্মঘট ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু তার প্রতি সমর্থন জানান। একই বছরের ২৯ মার্চ আন্দোলনে যোগ দেয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে অযৌক্তিক ভাবে জরিমানা করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেন। এদিকে ১৯৪৯ সালে পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ শুরু হলে খাদ্যের দাবীতে তিনি আন্দোলন শুরু করেন এবং ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি এই আন্দোলনের কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র যেখানেই এদেশের মানুষ নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন সেখানেই তার প্রতিবাদ করেছেন বঙ্গবন্ধু।এসব প্রতিবাদের কারণে ব্যক্তি মুজিব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তাঁর উপর অমানসিক নির্যাতন হয়েছে, হামলা, মামলা, হুলিয়া নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, তাঁর সন্তানেরা পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষার দাবীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদ মিছিলে গুলি চলে। শহীদ হন সালাম, রফিক, বরক সহ অনেকে। জেল থেকে বঙ্গবন্ধু এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেন। ১৯৫৫ সালের ১৭ জুন ঢাকার পল্টনের জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধু প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দাবী করেন। ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এসময় তার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেয়া হয়। বাঙ্গালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা, ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত হয়। তিনি ৬ দফার পক্ষে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা শুরু করেন। এ সময় তাকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বার বার গ্রেফতার করা হয় এবং ৩ মাসে তিনি ৮ বার গ্রেফতার হন। শেষ বার তাঁকে গ্রেফতার করে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়।

ঘাতকের ষড়যন্ত্র আর বুলেটে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন থেমে যায় মাত্র ৫৫ বছর বয়সে। কিন্তু সেই ৫৫টি বছর ছিল বারুদে ঠাসা। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন যেন মহাকালের এক রোমাঞ্চ উপন্যাস।

১৯৭৫ সালের পর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এদেশ থেকে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে আবার বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলায় রূপান্তরের কাজ করছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সংবিধানে যে অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করছেন।

১৭ই মার্চ শোষিত, বঞ্চিত, ভাগ্যাহত ও দুঃখী মানুষের বন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। সালাম, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি যিনি ছিলেন শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে।

লেখক: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর, পরিচালক, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র ও সাবেক প্রভোস্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আজসারাবেলা/সংবাদ/জাই/মতামত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here