কখন বাঙালি রেস্টুরেন্টের সাথে পরিচিত হয়?

0
151
ছবি: সংগৃহীত

সারাবেলা রিপোর্ট: রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতি গ্রীক ও রোমান সভ্যতায় দেখা গেলেও সেটা বর্তমান রেস্টুরেন্ট এর আদলে ছিল না। খ্রি.পূ ৫১২ প্রাচীন গ্রীসে রেস্টুরেন্টের প্রচলন শুরু হয়েছিল বলে ধরা হয়। সে সময় রেস্টুরেন্টগুলোর খাবারের তালিকা ছিল এক ধরণের। একটি প্লেটে বন্য পাখি ও পেঁয়াজ পরিবেশন করে রেস্টুরেন্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় রেস্টুরেন্টের চিত্র বিভিন্ন রকমের রূপ নেয়। রোমান সভ্যতায় রেস্টুরেন্টগুলো গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন পানীয়কে কেন্দ্র করে। যদিও তার সাথে অন্যান্য খাবার দ্রব্যও ছিল। রুটি, স্যুপ, পনির জাতীয় খাবার তালিকায় ছিল। পরবর্তীতে রেস্টুরেন্টের প্রচলন বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লেও সেটা তেমন দ্রুত গতিতে গড়ে উঠেনি।

আধুনিক রেস্টুরেন্টের রূপ প্রদানে ফ্রান্সের ভূমিকা অনেকবেশি। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে রেস্টুরেন্টের এর কাঠামো দাঁড় হতে শুরু হয়। বিভিন্ন রকমের খাবার পরিবেশন করা হতো সেসময় ফ্রান্সে গড়ে উঠা রেস্টুরেন্টগুলোতে। ফ্রান্সের পরবর্তী সময়কালে প্যারিস অঞ্চলে রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতি বেশ ভালভাবে গড়ে উঠেছে। ১৭৬৫ বা ১৭৬৬ সালে মাথুরিন রোজে দে নামে এক ভদ্রলোক ‘চ্যান্টোইসেউ রুয়ে দেস পোলিসে’ নামকরণে একটি রেস্তুরেন্ট গড়ে তুলে। বলা হয়ে থাকে এটাই প্রথম আধুনিক কাঠামোগত রেস্টুরেন্ট। পরবর্তী সময়ে রেস্টুরেন্টের প্রচলন ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বাঙালি কখন রেস্টুরেন্ট এর সাথে পরিচিত হয়েছে?

ইশ্বর গুপ্ত বলেছেন, ‘ভাত মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালী সকল’। ভাত ও মাছ বাঙালির প্রধান খাবার হলেও তার সাথে নানা খাবার সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষত, বঙ্গে বিভিন্ন জাতি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে আসার ফলে তাদের সংস্কৃতি যুক্ত হয়েছে। গ্রীক ও রোমান সভ্যতায় রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতি গড়ে উঠার সাথে বঙ্গেও এ সংস্কৃতির আর্বিভাব দেখা গিয়েছিল। প্রাচীন ভারতে ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে রেস্তুরেন্টের উল্লেখ ছিল। মূলত ইংরেজদের দিকে লক্ষ্য রেখে বঙ্গে রেস্টুরেন্টের প্রচলন শুরু হয়। ১৮৩০ এ দশক থেকে ইংরেজ তরুণরা রেস্টুরেন্ট এ আসা শুরু করে। এখানকার রেস্টুরেন্টগুলোর প্রচলন হয় মূলত নিষিদ্ধ খাবার অথবা পারিবারিকভাবে যেটা নিষিদ্ধ আছে সেটাকে কেন্দ্র করে। বাড়িতে যেসব খাবারগুলো পেত না সেটা রেস্তুরেন্ট থেকে খাওয়া হতো। ১৮৪০ এর দশকে রাজনারায়ন বসু গুরুর মাংসের কাবাব এবং মাইকেল মধুসূধন দত্ত মাংস, পেটিস ও বিস্কিট কিনে খাওয়ার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথমদিকে ইংরেজ বাবুর্চিরা রান্না করলেও পরবর্তীতে মুসলমান বাবুর্চিরা রান্না করতে শুরু করে। সেই থেকে মুসলমান বাবুর্চি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল।

পরবর্তী সময়কালে ইংরেজ রেস্টুরেন্টের আদলে বাঙালি নিজেরাই রেস্টুরেন্ট খোলেন। সেখানে শুধু ইংরেজী খাবার তালিকার সাথে মোঘলাই খাবারের প্রচলন শুরু হয়। বিশেষত, কোর্মা, কাবাব, বিরিয়ানি ইত্যাদি। মোঘলাই খাবার অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সেসময়। রাজনারায়ন বসুর আত্মজীবনী থেকে বিষয়টি সম্পর্কে জানা যায়। উনিশ শতক পর্যন্ত মোঘলাই খাবারের বেশি প্রাধান্য ছিল। তাছাড়া এ ধরণের রেস্টুরেন্টগুলো কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল। পরবর্তীতে সেটা ছড়িয়ে যায় বিভিন্ন অঞ্চলে। ইংরেজী রান্না বঙ্গদেশে খুব স্বল্প পরিমাণে রান্না করা হতো। তবে মোঘলাই অনেকবেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। যার ফলে রেস্টুরেন্ট গুলো খুব দ্রুতহারে গড়ে উঠতে শুরু করে। বৃটিশ আমলের পর পাকিস্তান আমলে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তান সময়কালে মোঘলাই খাবারের সাথে বিভিন্ন দেশের খাবার সংস্কৃতি তালিকায় লিপিবদ্ধ হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর রেস্টুরেন্ট সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। আশির দশক থেকে বাংলাদেশে রেস্টুরেন্টগুলোতে বর্তমান রেস্টুরেন্টগুলোর খাবার তালিকার যুক্ত হতে শুরু করে। তাছাড়া, বৈদেশিক সংস্কৃতির বিভিন্ন খাবার তালিকায় পরবর্তীতে তরুণদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। মূলত, এভাবে বাংলাদেশের রেস্টুরেন্ট ও খাবার সংস্কৃতির রূপলাভ করেছে।

লেখক: জামসেদুল ইসলাম, সহ-সম্পাদক, আজসারাবেলা

আজসারাবেলা/সংবাদ/ফিচার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here