ভ্যাকসিন নিয়ে অপপ্রচার চলছেই

0
255

জব্বার হোসেন
শুধু বাংলাদেশ নয় সারা দুনিয়াই এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জীবন ও জীবিকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে মানুষকে। যে কোনো প্রতিকূল সময়ে মানুষ এক হয়, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়- মানুষের পাশে দাঁড়াতে। ভুলে যায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য। দেশ-ভূগোল। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে একতাবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করে, লড়াই করে। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু কিছু মানুষ আর তাদের রাজনীতি সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র এনে দাঁড় করিয়েছে যা হতাশার, লজ্জার। মানবিকতার বিবেচনায় অমানবিক তো বটেই; তা আর বলবার অপেক্ষা রাখে না।

সারা দুনিয়াই চাইছে ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে। ভ্যাকসিন এখন পৃথিবীর প্রতিটি দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, টিকে থাকা, সফল হওয়া কোনটিই খুব সহজ কাজ নয়। একই সঙ্গে দুনিয়ার তাবৎ শক্তিমান দেশ প্রতিযোগিতা করছে এ কথা ভুলে গেলেও চলবে না। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশের ভ্যাকসিন সফলতা কারো চেয়ে কম নয় বরং বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় এক বিরাট সাফল্য।

বলা হলো বাংলাদেশ ভ্যাকসিন আনতে পারবে না। বাংলাদেশ পারলো। ভ্যাকসিন যদি ভালোই হয় তবে প্রথম ভ্যাকসিন নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু এই প্রধানমন্ত্রী তো আর দশজন প্রধানমন্ত্রী বা শাসক-শোষকের মতো নয়। তিনি বঙ্গবন্ধুকন্য শেখ হাসিনা। দেশের মানুষকে না দিয়ে তিনি ভ্যাকসিন সবার আগে নিয়ে ‘রাজরানী’ হয়ে বসে থাকবেন সেই অবিবেচক তিনি নন। এখন যখন দেশের প্রতিটি মানুষ ভ্যাকসিন পেতে মরিয়া, ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে সমর্থ, সরকারও গণটিকা কার্যক্রম শুরু করেছে তখন বলা হচ্ছে- গণটিকা গণসংক্রমণের জন্য দায়ী। টিকা সংক্রমণ তৈরী করে না-কি সংক্রমণ রোধে কাজ করে; সেটিও বিবেচনায় নেই।

সরকারের সমালোচনা নিশ্চয়ই করা যাবে। সমালোচনা করতেও হবে। উদার ও গণতান্ত্রিক দেশ ও রাষ্ট্র হিসেবে এটাই বাংলাদেশের জনমানুষের শক্তি ও সৌন্দর্য। কিন্তু তা-ই বলে দেশের মানুষের মঙ্গল চিন্তা না করে, মানুষকে টিকা থেকে সরিয়ে নিতে এমন জনবিরোধী, দেশ ও রাষ্ট্রবিরোধী মন্তব্য, উষ্কানি, অপতৎপরতা- কেবল অসভ্যতা নয়, অমানবিক। পাশাপাশি দেশকে রাজনীতি শূণ্য করবার চেষ্টাও।

বাংলাদেশ শুধু ভারত থেকে টিকা আনতে চেয়েছিল। ভারতীয় টিকা। যারা এই অপপ্রচার করেছেন তারা জানেন না ভারত কোনো টিকা বানায়নি, তাহলে ভারতীয় টিকা- এ কথাটি সর্বৈব মিথ্যা। ভারত টিকা বানানোর প্রক্রিয়ায় ছিল। ট্রায়ালও শেষ করেনি তখন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পায়নি। এখন পর্যন্ত ভারতীয় কোনো টিকা অনুমোদন পায়নি।

বাংলাদেশ ভারতসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে একই সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছিল। যার কারণে এত দ্রুত দেশে টিকা আনা সম্ভব হয়েছিল।

বাংলাদেশ, ভারত ও বেক্সিমকো মিলে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির বারোটা বাজিয়েছে, যারা এই অপপ্রচার করেছেন এবং এখনো করছেন তারা কি জানেন না, সেরাম ভারতের একটি বেসরকারি কোম্পানি? সেরামের সঙ্গে অ্যাসট্রাজেনেকার চুক্তি হয়েছে। সেরামকে অ্যাসট্রাজেনেকা উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে। বেক্সিমকো সেরামের সঙ্গে চুক্তি করেছে ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অগ্রীম দিয়ে টিকার ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পাবার জন্য। বেক্সিমকো ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পাওয়ার ফলে সরকার ৩ কোটি টিকা ক্রয় করার জন্য সেরাম ইনস্টিটিউটকে বুকিং দেয় এবং প্রদেয় প্রদান করে। সেই হিসাবে ৩ কোটি টিকা পাবার কথা যার মধ্যে ৭০ লাখের মতো পাওয়া গিয়েছে। বাকি ২ কোটি ৩০ লাখ পাওয়া যাবে ভারত থেকে সেরামের মাধ্যমে।

ভারত যে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ভয়াবহতার শিকার হয়েছে তা সারা বিশ্ব জানে। ভারতের এই আপদকালীন সময় মোকাবিলার জন্য সারা বিশ্ব তখন টিকা সহায়তা দিতে চেয়েছে। কেননা ভারতকে তখন সহযোগিতা না করা গেলে ভারত তার পাশ্ববর্তী দেশসহ সকলের জন্য চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছিল। দেশটিও চেয়েছে এই ভয়াবহ সময়ে কোনো টিকা যেন বাইরে না যায়। এমনকি চীন, আমেরিকা নিজ দেশের মানুষের জন্য টিকা নিশ্চিত করে পরে অন্যদের দিয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো, ভারত যে বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন সহায়তা দিয়েছে তা সেরাম থেকে কিনে বাংলাদেশকে দিয়েছে। অক্সিজেনও দিয়েছে। আর সেরামের কাছে যে টিকা পাওনা রয়েছে তা পরবর্তীতে ধাপে ধাপে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ সরকার বেক্সিমকোকে বেসরকারিভাবে কোনো ভ্যাকসিন যেন বিক্রি করা না হয় সেই নির্দেশনাও দিয়েছে। ফলে বেক্সিমকো ভ্যাকসিন নিয়ে চরম বাণিজ্য করছে এ কথাটিও অমূলক।

ভ্যাকসিন নিয়ে অপবাদ আর অপপ্রচারের শেষ নেই। বাংলাদেশ চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেতে ৩ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার টিকা পেয়েছে। এ মাসে আরও ১ কোটি টিকা পাবে তা নিশ্চিত। ডাব্লিওএইচও’র আওতায় কোভ্যাক্সের মাধ্যমে চীনের দেওয়া আরও ১৭ লাখ টিকা এ মাসেই আসবে। সিনোফার্মার কাছ থেকে কেনা আরও ৫০ লাখ টিকাও আসবে এ মাসেই। জাপানের উপহার অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ১৩ লাখ ৫৭ হাজার টিকাও পৌছবে ক’দিনের মধ্যেই। সরকার ৮০ শতাংশ মানুষকে খুব দ্রুতই টিকার আওতায় নিয়ে আসবে। কিন্তু তারপরও অপপ্রচার, নিন্দা, মিথ্যাচার হয়তো চলতেই থাকবে।

সত্য আর মিথ্যার লড়াই চলেছে চিরকাল; চলবেও। সত্যকে প্রমাণ করতে হয় কাজ দিয়ে আর মিথ্যার জন্য কোনো কাজ প্রয়োজন হয় না, প্রমাণেরও দরকার পরে না। তবে মানুষের জীবন ও জীবিকার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যারা মিথ্যা অপবাদ, অপপ্রচার করতে ব্যস্ত তারা একটু হলেও ভাববেন, মানুষের কথা, বিবেকের কথা। দুঃখিত, হয়তো তাদের ভাববার সেই সময় ও বোধটুকু নেইও।

লেখক : সম্পাদক, আজ সারাবেলা; সদস্য, ফেমিনিস্ট ডট কম, যুক্তরাষ্ট্র।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here