বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড : একটি পরিবারের অনুভূতি ও বিভীষিকাময় স্মৃতি

0
150

ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান হেলাল
১৪ই আগস্ট ১৯৭৫। সম্ভবত প্রাইমারির চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। প্রতিদিনের মত খেলাধুলা শেষ করে স্কুলের মাঠে একা বসে ছিলাম। শরীরটা প্রচণ্ড ঘামছিল আর ভেতরে ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছিল, কোন কারণ ছাড়াই। এভাবে অনেকক্ষণ একা বসে ছিলাম মাঠে। আমাদের বাড়িতে এক ধরনের সান্ধ্যআইন ছিল- খেলাধুলা শেষ করে সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। হাতমুখ ধুয়ে বসতে হবে পড়ার টেবিলে। সেদিন কখন যে এই সান্ধ্যআইন ভঙ্গ করেছি তা বুঝতেই পারিনি।

আমাদের বাড়িটি ছিল কাঠের দুই তলা। মাঝখানে ছিল একটা বড় উঠোন। বাড়ির বাইরের দিকের ঘরটি ছিল আব্বার রাজনৈতিক অফিস। অফিসটি ঘিরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতি পরিচালিত হতো। আমার আব্বা মরহুম আব্দুল মালেক সে সময় জাতীয় সংসদ সদস্য। মা একজন গৃহিনী। সারাদিন সংসার সামলাতে ব্যস্ত থাকতেন মা। যতটুকু অবসর পেতেন ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন। আমাদের ছয় ভাই ও তিন বোনের সবারই শৈশব কেটেছে এই বাড়িতে।

আমাদের বাড়ির নিচের তলায় মূল ঘর যেখানে আব্বা-মা ও আমরা ছোট তিন ভাই থাকতাম। সে ঘরে বঙ্গবন্ধুর ছবি মাঝখানে। একপাশে আব্বা অন্যপাশে মা। পাশাপাশি বড় ভাই-বোনদের সাদাকালো ছবি টাঙ্গানো দেয়ালে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধুর ছবিটি কোন কারণ ছাড়া মেঝেতে পড়ে গেল! ছবির ফ্রেমটি ভেঙ্গে যায় আর মাঝখান দিয়ে ভেঙ্গে দু’ টুকরো হয়ে যায় ফ্রেমের কাঁচ। তখন দু তলা থেকে নিচে নামছিল আমার বড়বোন। বঙ্গবন্ধুর ছবিটি মেঝেতে পড়তে দেখে দৌড়ে গিয়ে ছবিটা হাতে তুলে নিল পরম মমতায়। দাঁড়িয়ে রইল হতবিহবল হয়ে। আমার মা ঘটনাটি দেখে এক অজানা শঙ্কায় কাঁদতে লাগল আর বলতে লাগল আমি গতরাত্রে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। এ কথা শুনে আমার বড়বোন রেডিও চালু করলেন। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে- খবর শুনে সবাই একসঙ্গে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। কারণ এ ধরনের নির্মম ও ভয়াবহ শোকের খবর আমরা কেউই ঘুর্নাক্ষরে চিন্তাও করিনি। এ খবর শুনে পরিবারের সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল, বিশ্বাস হচ্ছিল না কারোই। সবাই কান্নাকাটি করছিল আর একে অপরের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। সে সময় আব্বা ঢাকায় এমপি হোস্টেলে অবস্থান করছিলেন, কোনভাবেই তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না।

সারাদিন রেডিওতে একই খবর বারবার প্রচার হতে লাগলো, সেই সঙ্গে খুনি মেজর ডালিমের নির্মম-নিষ্ঠুর কন্ঠে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ঘোষণা। পরিবারের সবাই এতটাই শোকাহত হতাশায় নিমজ্জিত যে সেদিন বাড়িতে কোন রান্না হয়নি আমরা কেবল কিছু শুকনা খাবার খেয়ে দিন পার করেছিলাম।

মাকে দেখেছি দিনরাত কাঁদতে। মা প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সকল শহীদদের জন্য দোয়া করতেন। দেশে না থাকার কারণে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা’র মঙ্গল ও সুরক্ষা কামনা করে দোয়া করতেন এবং তাদের জন্য নফল নামায আদায় করতেন।

মা’র মধ্যে একটা ভয়, উৎকন্ঠা কাজ করতে লাগল। বলেই ফেললেন যারা বঙ্গবন্ধুর মতো মহান ও বিশাল হৃদয়ের মানুষকে সপরিবারে হত্যা করতে পারে, তারা আমার সন্তানদের হত্যা করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করবে না। ভয়ে আমাদেরকে বাড়ির বাইরে যেতে দিতেন না। অনেকটা চোখেচোখে রাখার মত। এভাবেই কাটলো বেশ কিছু দিন।

এর মধ্যে একটি বিষয় লক্ষ করলাম, সেটা হল- আমাদের বাড়িটা ছিলো বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের পদচারণায় মুখরিত, দলীয় লোকজন আব্বার অনুপস্থিতেও অফিসে প্রায়ই আসতো এবং নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতো। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর আমাদের বাড়িতে লোকজনের আসা যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। খবর নেওয়া তো দূরের কথা বাড়ির আশেপাশে কাউকে দেখা গেল না। যে বাড়িটি ছিল দিনভর মানুষের উপস্থিতিতে সরব, কোলাহলপূর্ণ তা যেন পরিণত হয়ে গেল এক নির্জন শ্মশানে।এদিকে আব্বার খবর নেই, সবাই খুব শঙ্কিত। একদিন এক ভদ্রলোক বাড়িতে এসে মা ও বড় বোনকে গোপনে খবর দিলেন, যেটা বুঝতে পেরেছিলাম আব্বা আপাতত নিরাপদে আছেন।

পরবর্তীতে যখন আমি প্রাপ্তবয়স্ক, একদিন আব্বার মুখে তার বর্ণনায় শুনি সেদিনের ঘটনা। ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর কিছু সেনাসদস্য এমপি হোস্টেল ঘিরে রাখে, কারোই বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। এ ধরনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে আব্বা জানতে পারেন খুনি খন্দকার মোশতাক যে কোনো সময় অধিবেশন ডাকবেন। তাদেরকে খুনি খন্দকার মোশতাক সরকারকে বৈধতা দেওয়ার জন্য সংসদে নিয়ে যাবেন। আব্বা মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন তিনি সংসদ অধিবেশনে যোগদান করবেন না কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুবই কঠিন ছিল। এমপি হোস্টেলে কাছেই নাখালপাড়াতে তার একজন পরিচিত ভদ্রলোকের বাসা ছিল, যার নাম গিয়াসউদ্দিন, বাড়ি পিংনা, তিনি আব্বার খুব ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। আব্বা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমপি হোস্টেলের পিছন দিয়ে দেয়াল টপকে গিয়াস উদ্দিন সাহেবের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। এভাবে আব্বা খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদের অধিবেশনে যোগদান থেকে বিরত থাকতে সক্ষম হয়েছিলেন। আব্বার এ ধরনের দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তের জন্য আমরা গর্বিত, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সত্যিকারের সৈনিক পরিচয় দিয়েছিলেন।

একটা বিষয় মনে পড়ছে, সে সময় কিছু সাদা পোশাকধারী লোকজন আমাদের বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতো, যাদেরকে ইতিপূর্বে কখনো দেখিনি। বিষয়টি তখন বুঝিনি, পরবর্তীতে আব্বার ঘটনা শুনে বুঝতে দেরী হলো না যে, সেই সময় আমাদের বাড়িটি কড়া নজরদারিতে ছিল, আব্বাকে ধরে নেওয়ার জন্য।

স্কুলে যাওয়া একদম বন্ধ, সন্ধ্যার আগে নিজ বাড়ি ত্যাগ করে অন্যের বাড়িতে রাত্রিযাপন, খুব সকালে আবার বাড়িতে ফেরত আসা, এভাবেই চলতে থাকলো আমাদের সবার জীবন।
এর বেশ কিছুদিন পর আব্বা বাড়িতে এসেছিলেন। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, আব্বাকে তখন খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিলো। সেদিন রাতেই তৎকালীন কিছু সেনাসদস্য আমাদের বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং আব্বাকে ঘুম থেকে তুলে করে ধরে নিয়ে যায় জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে আর্মিদের অস্থায়ী ক্যাম্পে। সামান্যতম বিচলিত হতে দেখিনি আব্বাকে। আমরা ভেবেছিলাম আর বোধহয় আব্বার সঙ্গে কখনো দেখা হবে না। সৌভাগ্যের বিষয়, সারারাত জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সকালে ছেড়ে দেওয়া হয়। সকালে আব্বাকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি।

একটি কথা না বললেই নয়, জাতীয় চার নেতার সাথে আব্বার খুব সখ্যতা ছিল, বিশেষ করে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহেবের সাথে। ৩ নভেম্বর জেলহত্যার খবর জানার পর আব্বাকে খুব বিচলিত হতে দেখেছি। তাই ৬ নভেম্বর জাতীয় চার নেতার জন্য জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করেছিলেন। ৭ই নভেম্বর পটপরিবর্তনের পরে আব্বার উপর হুলিয়া জারি হয়। কিছু দিনের জন্য আত্মগোপনে চলে যান আব্বা। আর আমরা নিরাপত্তাজনিত কারণে কাজিপুর নানার বাড়িতে আশ্রয় নেই।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিটি দিন ছিল উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার, প্রতিটি রাত ছিল বিভীষিকাময়। ছোটকালের অনেক স্মৃতি মনে নেই। তবে ১৯৭৫ সালের ১৪ই আগস্ট বিকাল থেকে পরবর্তী কয়েক মাসের ঘটনাগুলো এখনো স্মৃতিপটে অম্লান।

লেখক: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ এবং সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরিষাবাড়ি, জামালপুর।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here