উইঘুর মুসলিম গণহত্যাকে সমর্থন দিলো ইমরান খান!

0
67

হাসান ইবনে হামিদ:

এক. ‘সত্যি কথা, আমি উইঘুর সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। ব্যাপারটি সম্পর্কে আমার যথেষ্ট জানা থাকলে আমি এ ব্যাপারে কথা বলতাম। এ ছাড়া চীনে মুসলিমদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, সে বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে বেশি কোনো খবর নেই।’ – ২০১৯ সালের ৬ মার্চ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এই বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। এর আগে একই বছরের জানুয়ারি মাসে তুর্কির এক টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইমরান খান একই বক্তব্য দিয়েছিলেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে উইঘুর সম্পর্কিত কিছুই তিনি জানেন না বা বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমে নাকি এ নিয়ে কোন খবর উনার চোখে পরেনি! অথচ বর্তমান বিশ্বের আলোচিত ও সমালোচিত যে ক’টি গণহত্যা আছে তার মধ্যে উইঘুর একটি। দীর্ঘ ৭২ বছর যাবত চীন সরকার উইঘুরে ভয়াবহ নির্যাতন ও জনসংখ্যাগত গণহত্যা চালাচ্ছে যা বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনাম হিসেবে হরহামেশাই আমরা দেখতে পাচ্ছি, কেবল দেখেননি পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান! এমনকি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, জাতিসংঘের মানবাধিকর বিষয়ক কমিটির মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বছরের পর বছর উইঘুর নিয়ে যে প্রতিবেদন গণমাধ্যমে উন্মোচন করছে তাও ইমরান খানের অজানা!

দুই. ‘পাকিস্তানের সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক সংকটে চীন সহায়তা করেছে ফলে উইঘুর নিয়ে চীনের সঙ্গে গোপনে আলোচনা করা হয়- প্রকাশ্যে নয়। কারণ বিষয়গুলো স্পর্শকাতর।’ – ডয়েচে ভেলে’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ইমরান খান এই বক্তব্য প্রদান করেন। পাঠকরা আশা করি বুঝতে পারছেন এই এক বছর অর্থাৎ ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মাঝে ইমরান খানের জ্ঞানার্জনের দিকটাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে এবং উনি উইঘুর সম্পর্কিত পড়াশুনা করেন। ফলে এবার তিনি ২০১৯ সালের সাক্ষাৎকারের মতো বলেননি যে, উইঘুর সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। বরং তিনি জানান, চীন যেহেতু তাদের বন্ধু তাই তারা উইঘুর নিয়ে রুদ্ধদ্বার আলোচনা করছেন! মানে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে উইঘুরের গণহত্যা নিয়ে নীরব থাকার পলিসি নিয়েছেন তিনি বা তার দেশ পাকিস্তান। তাই যদি, তবে, কিন্তু অব্যয় বিশেষণে চীনের গণহত্যাকে এড়িয়ে যেতে চাইছেন। মূলত ২০২০ সালের আগেই উইঘুর নিয়ে পাকিস্তানের নীতি সবার কাছে পরিস্কার হয়ে যায়। চীনের নাচের পুতুল হিসেবে টিকে থাকা ইমরান খানের পিটিআই সরকার যে চীনকে উইঘুর ইস্যুতে বাধা নয় বরং সমর্থন দিচ্ছে তা জানতে কারো বাকি থাকে না।

তিন. ‘চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসকারী উইঘুর মুসলিমদের প্রসঙ্গে চীনা রাষ্ট্রপতি জিনপিং- এর নেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ইসলামাবাদ। চীন জিনজিয়াংয়ে কোনো অন্যায্য আচরণ করছে না। চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝতে পেরেছি, তা পশ্চিমের প্রচারিত জিনজিয়াং পরিস্থিতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।’- চীনের ন্যাশনাল ডে উপলক্ষ্যে গত ১ জুলাই পাকিস্তানের সংবাদ সংস্থা দি ডন (The Dawn)-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরান খান এই কথা জানান। ২০১৯ থেকে ২০২১ এই দুইবছরে ইমরান খানের বক্তব্যে যে আমূল পরিবর্তন আসে তা একটু লক্ষ্য করলেই আমরা দেখতে পাই। অর্থাৎ উইঘুর সম্পর্কে আগে উনি কিছুই জানেন না, উইঘুর নিয়ে রুদ্ধদ্বার আলোচনা করছেন এসব বক্তব্য যে ছিলো সম্পূর্ণ ভাঁওতাবাজি তা ২০২১ এ এসে ইমরান খান নিজেই পরিস্কার করে দিলেন। ইমরান খান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন চীনের গণহত্যার পক্ষে তার অবস্থান। উনি পশ্চিমাদের উপর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব চাপিয়ে দিয়ে ১৯৪৯ সাল থেকে চীন কর্তৃক ঘটা উইঘুর মুসলিম গণহত্যাকে অস্বীকার করেছেন। জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, বিবিসি, সিএনএনসহ তাবৎ দুনিয়ার সকল তথ্য উপাত্তকে অস্বীকার করে চীন সরকারের বক্তব্যের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, বর্তমান পৃথিবীর এক জঘন্যতম গণহত্যাকে সমর্থন দিয়েছেন।

চার. চীনের শিনিজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিম নির্যাতনের কাহিনী বহু পুরোনো। চীনের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সবচেয়ে বড় প্রদেশ এটি। শিনজিয়াং কাগজে কলমে স্বায়ত্তশাসিত হলেও, চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এই অঞ্চলের শহরগুলোর ভেতর দিয়েই গেছে সিল্ক রোড, তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিনজিয়াং এর অর্থনীতি কৃষি ও বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উইঘুররা নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৪৯ সালে চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কিছুদিন পর চীনের কমিউনিস্ট সরকার উইঘুরদের বৃহত্তর চীনের সাথে যোগ দেয়ার প্রস্তাব জানায়। প্রস্তাব মেনে না নেয়ার পর থেকে শুরু হয় উইঘুর মুসলিমদের উপর নির্যাতন, নেমে আসে বিভীষিকাময় অত্যাচারের খড়গহস্ত। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে উইঘুরদের ধর্ম ও সংস্কৃতির স্থলে কমিউনিজম চাপিয়ে দেওয়ার জন্য চীনা কমিউনিস্টরা উঠে পড়ে লেগে যায়, এর অংশ হিসেবে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। তারা নামাজ রোজা রাখতে পারেন না, কোরআন ও অন্যান্য ইসলামিক জ্ঞান অর্জন করতে পারেন না, নারীরা হিজাব চাইলেও পড়তে পারেন না এমনকি সরকারী চাকুরিতে হিজাবী নারীদের নিয়োগ পথ বন্ধ; এক কথায় ধর্মীয় স্বাধীনতার সকল পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সরকারীভাবে। সেখানে ধর্মীয় প্রার্থনালয় ভেঙে দেয়া হয়। ধর্মীয় কার্যাবলীর উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। চীনাদের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে যখন উইঘুররা বিদ্রোহ করা শুরু করে তখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তায় হাজার হাজার নিরীহ উইঘুর কে হত্যা করা হয়। একই সাথে অনেককে করা হয় গৃহহীন। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা বাড়িতে ঢুকে প্রিয়জনদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, সন্তানদের ধরে নিয়ে রাখা হচ্ছে ক্যাম্পে। এরকম ভীতিকর পরিস্থিতির মাঝেই চলছে তাদের জীবন।

পাঁচ. মানবাধিকার সংগঠনগুলো নানাসময়ে তথ্যপ্রমাণসহ উইঘুর গণহত্যাকে সবার সামনে তুলে ধরেছেন। আপনাদের সকলের জ্ঞাতার্থে এরকম বেশ কয়েকটি রিপোর্ট তুলে ধরছি। ২০১৯ সালে চীনের উইঘুর নিয়ে বেশ কিছু অজানা তথ্য দেয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তারা জানায় উইঘুর সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর কড়া নজর রাখতে তাদের বাড়িঘরের দরজায় লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ কোড, বসানো হয়েছে মুখ দেখে সনাক্ত করা যায় এরকম ক্যামেরা। ফলে কোন বাড়িতে কারা যাচ্ছেন, থাকছেন বা বের হচ্ছেন তার উপর কর্তৃপক্ষ সতর্ক নজর রাখতে পারছে। তাদেরকে নানা ধরনের বায়োমেট্রিক পরীক্ষাও দিতে হচ্ছে। আবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটি ২০১৮ সালের অগাস্ট মাসে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, প্রায় ১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ কেন্দ্রগুলোয় আটক রাখা হয়েছে। ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্বিবেচনার শিবিরে’ অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছে। সম্প্রতি বিবিসির এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যার সূত্র ধরে চীনে বিবিসি নিষিদ্ধ করেছে সেদেশের সরকার। বিবিসির রিপোর্টের সাথে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটির রিপোর্টের হুবুহু মিল আছে। বিবিসির অনুসন্ধানী রিপোর্টে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত তুরসুনে জিয়াউদুন নামে একজন নারীকে উপস্থাপন করা হয়। চীন সরকারের তথাকথিত শিক্ষাশিবিরের যে বর্ণনা তিনি সেখানে দিয়েছেন তা শুনে যেকারো গা শিউরে উঠবে। ‘পুনঃশিক্ষণ’ বা শিক্ষাশিবির এ থাকাকালীন তুরসুন জিয়াউদুনের নির্মম অভিজ্ঞতা সম্প্রতি বিবিসিতে বলেছেন। তুরুসুন মূলত কাজাখ নামে একজনকে বিয়ে করেছিলেন এবং সেখানেই স্থায়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালে শিনজিয়াং ফিরে গেলে তুরসুন ও তার স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। স্বামী ছাড়া পেলেও তিনি ছাড়া পাননি এবং ২০১৮ সালে তুরসুন জিয়াউদুনকে আরো ‘শিক্ষা’ দরকার বলে চীন পুলিশ তাকে শিক্ষাশিবিরে পাঠায়। চীনা শিক্ষাশিবিরে এনেই তুরসুন জিয়াউদুনের অলংকার খুলে ফেলা হয়, কানের দুল ছিঁড়ে নিয়ে কান রক্তাক্ত করা হয়। তার সামনেই নারীদের হিজাব টেনে খুলে ফেলা হয়, অন্তর্বাস ছাড়া আর সব কাপড় খুলে নেয়া হয়। অনেকে দু হাত দিয়ে তার লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। কোন কিছুতে বাধা দিলেই পেটে লাথি মেরে রক্তাক্ত করা হয়। ‘কালো ঘর’ নামক টর্চার সেলে নিয়ে অনেককেই বৈদ্যুতিক শক দেয়া হতো, যৌনাঙ্গে ইলেক্ট্রিক লাঠি প্রবেশ করানো হতো। তুরুসুন জিয়াউদুনের এই নির্মম অভিজ্ঞতার পূর্বেও চীন সরকারের এই ‘পুনঃশিক্ষণ’ সম্পর্কে কমবেশি সকলের জানা ছিলো। ক্যাম্পে যাদেরকে রাখা হয়েছে তাদেরকে চীনা ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানো হচ্ছে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রশংসার কথা বলা এবং তাদের সঠিক আচরণ পরিচালনার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মনে রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সমালোচনা করতে অথবা সেই ধর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ অভ্যাসগুলোর অংশ হিসেবে চীন সরকার সাংঘর্ষিকভাবে শিনজিয়াংয়ের উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই শিক্ষাশিবিরের পাশাপাশি উইঘুর শিশুদের ক্যাম্প ও স্কুল রয়েছে, যেখানে তাদের পরিবার, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। উইঘুরে ২০১৬ সালে ‘মেকিং ফ্যামিলি’ নামের একটি উদ্যোগ চালু করে চীন। এর মাধ্যমে উইঘুর পরিবারকে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে পাঁচ দিনের জন্য তাদের ঘরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের হোস্ট করতে বাধ্য করে। নারীদের সেখানে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ করা হয় যেনো নতুন কোন উইঘুর শিশু জন্ম না নিতে পারে।

ছয়. পরিকল্পিত গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, গণ-নজরদারি, বন্দীত্ব, মগজ ধোলাই জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ এবং হত্যাসহ নানা ভয়াবহতার সাক্ষী আজ উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়। পুরো পৃথিবী চীনের এই নৃশংসতা জানলেও জানেনা শুধু পাকিস্তান, শুরুতে তারা এটাই বলেছে। আর আজ এসে ইমরান খান এই গণহত্যাকে সরাসরি সমর্থনও দিয়েছে। হায়রে রাজনীতি, উইঘুরের গণহত্যাকে একদিকে সমর্থন দিচ্ছে আবার অন্যদিকে কাশ্মীরের মুসলিমদের নিয়ে চিন্তায় রত! নিজে বেলুচিস্তানে মুসলিমদের ওপর নির্যাতন করলেও গলাবাজি এবং মায়াকান্না করছেন ভারতে অবস্থানরত মুসলমানদের অবস্থা নিয়ে! এতোটা কপটতা ভন্ডামী বোধহয় রাজনীতিতেই সম্ভব। না-হলে যে পাকিস্তান একাত্তরে বাংলাদেশ গণহত্যা চালিয়েছে, যে পাকিস্তান বেলুচদের উপর গণহত্যা চালাচ্ছে, যে পাকিস্তান উইঘুরের মুসলিম গণহত্যাকে সমর্থন দিচ্ছে তারা কিভাবে আবার মানবতার সবক দেয়, মুসলমানদের অধিকার নিয়ে বক্তব্য বিবৃতি দেয়। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, জাতিসংঘসহ বিশ্ববিবেক এবার অন্তত প্রতিবাদে সোচ্চার হবেন, চীনের এই গণহত্যা বন্ধে তারা কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন এবং পাকিস্তানের মতো গণহত্যাকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হবেন।

লেখক: রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here