সাহারা খাতুন এক রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা

0
83

এডভোকেট নাসরীন সিদ্দিকা লিনা
কক্সবাজারের শিক্ষা জীবনে ছাত্রলীগ করেছি। ১৯৯৮ সালে ঢাকার সন্ট্রাল ল’ কলেজে এসে পেলাম সাহারা আপার হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী আইন ছাত্র পরিষদ। ২০০৪ সালে কক্সবাজার জেলার বর্তমান পিপি সাহেব ফরিদ আঙ্কেল, পিজুষ আঙ্কেলের প্রচেষ্টায় জুনিয়র হিসেবে যুক্ত হলাম এডভোকেট সাহারা খাতুন এন্ড এসোসিয়েটসয়ে। সেই থেকে রাজনীতি ও আইনঙ্গনে শ্রদ্ধেয় সাহারা আপার সাথে আমার পথচলা।

আপা আওয়ামী লীগের তৎকালীন আইন সম্পাদক হওয়ার কারণে নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক মামলা বিনা পারিশ্রিকে করার সুযোগ পাই- এ যেন পরম প্রাপ্তি। সারাদিন আদালতে মামলা, রাজপথে চারদলীয় ঐক্য জোটের বিরুদ্ধে আন্দোলন, মিছিল আর অবরোধ। ২১শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলার দিনও মিটিংয়ে যোগদান- সবটুকু সম্ভব ছিল সাহারা আপার সান্নিধ্যের কারণে।

আপা আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়াতেন, আমাদের কাছে মনে হতো সেটাই যেন আমাদের পারিশ্রমিক। তবে আপার বাসা থেকে আপার জন্য যে খাবার আসতো তার কিছু ভাগ আমার জুটতো। সুধা সদনে নেত্রীর সাথে দেখা করতে যাওয়া, ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সভায় যাওয়া, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সান্নিধ্যে যাওয়া, শ্রদ্ধেয় সাজেদা আপা, মতিয়া আপার সাথে আন্দোলনে অংশগ্রহন -সেটাও ছিলো সাহারা আপার বদৌলতে।

১৬ জুলাই ২০০৭, যেদিন বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়। সেই আইনী লড়াইয়ে সাহারা আপার সাথে আমিও ছিলাম এবং নেত্রীর মুক্তি আন্দোলনে সাহারা আপার নির্দেশে বিভিন্ন কর্মসুচী আমরা সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। ২০০৮ -এর জাতীয় নির্বাচন। সাহারা আপা ঢাকা-১৮ আসনে নৌকার প্রার্থী, আমরা আইনজীবীরা আপার নির্বাচনী প্রচারণায় গেলে আপাই আমাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ -এর পক্ষ থেকে প্রতিটি আসনের নৌকার প্রার্থীর জন্য কাজ করার, আমরাও তা—ই করেছি। কতোটা নিঃস্বার্থ ছিলেন সাহারা আপা।

২০০৯ সালে সাহারা আপা প্রথম মহিলা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে নাম লিখালেন। ফুল নিয়ে পৌছে গেলাম আপার ফার্মগেটের বাসায়, বললাম আপা আপনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হয়েছেন, আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই, সত্যি আমি অন্তত আপার কাছে নিজের জন্য কিছু চাইতে যাইনি। আপা রাষ্ট্রীয় দ্বায়িত্বে এতোটাই ব্যাস্ত হয়ে গেলেন, আপা না ডাকলে নিজে থেকে ২৫ বেইলী রোড এর বাসায় খুব একটা যেতাম না।

পাঁচ বছর মন্ত্রী থাকার পর ২০১৪ সালে আপার ফার্মগেটের বাসায় একটি মামলার ফাইল নিয়ে হাজির হলাম। বললাম, আপা এটা খুব জটিল মামলা আপনাকে শুনানি করতে হবে। আপা বললেন পাঁচটা বছর মামলা করি না, থাক্; তুমি করে ফেলো। আমি বললাম, খুব কঠিন, আপনি আসলে ভালো হয়। প্রকৃত পক্ষে আমি চাইছিলাম আপা আবারও কোর্টে আসুক। অনেকটা আপাকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা। আপা হাইকোর্টে আসা শুরু করলেন। আবারও শুরু হলো আপার সান্নিধ্যে পথচলা।

মামলা করতে গিয়ে দেখেছি, আপা মামলার প্রতিটি লাইন পড়েন। ভালো প্রস্তুতি ছাড়া কখনও কোর্টে মুভ করতেন না। আল্লাহ রহমত, আমরা কখনও হারিনি। একদিন খুব ভালো ফি দেয়ার কথা বলে আমাকে দিয়ে একটি মামলা আপার কছে পাঠানো হলো, ফাইলটা আমি পড়ে শুনাচ্ছিলাম, আওয়ামী লীগের কোন কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, আপা ক্ষিপ্ত হয়ে মামলাটা ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন- ‘আমি ওকালতি করি ইনকামের জন্য নয় বরং আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য’। আপা নিজেও কখনও জঙ্গি, জামাত, বিএনপি’র পক্ষে মামলা করেননি, আমাদেরকেও করতে শেখাননি।

আপার সাথে আমার একটি স্মরণীয় দিন ৬ নভেম্বর ২০১৮। সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের জঙ্গিবাদ বিরোধী সেমিনারে সাহারা আপা মূখ্য আলোচক আর আমি বিশেষ আলোচক, সমন্বয়ক কানতারা খান, সঞ্চালক, জাব্বার হোসেন। স্থান সেই ঐতিহ্যবাহী সেন্ট্রাল ল’ কলেজ; যা ছিল ১৯৯৮ সালে আপার বক্তব্যের প্রতিফলন।

সাহারা আপার জীবনের সর্বশেষ শুনানি ছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০; ‘জয় বাংলা কেন জাতীয় স্লোগান হিসেবে স্বীকৃত হবে না’। আর আপার শেষবারের মতো সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ আয়োজিত ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর আলোচনা ও কেক কাটার অনুষ্ঠানে।

আপার রাজনীতির হাতেখড়ি তাঁর বাবার কাছ থেকেই। বাবা পল্টন ময়দানে বড় বড় জনসভায় তাঁকে অনেক সময় নিয়ে যেতেন। ‘৫৪র যুক্তফ্রন্ট -এর নির্বাচনে কুর্মিটুলা প্রাইমারী স্কুলের মাঠে নির্বাচনী মঞ্চে প্রথম বক্তব্য প্রদান করেন আপা। ১৯৬৬ সনে তিনি সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পান। সাজেদা আপা সাহারা আপাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন- মেয়েটি খুব কাজের। বঙ্গবন্ধু সাহারা আপাসহ যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ছয়দফার বুকলেট। সাহারা আপা আরও কয়েকজন মহিলা নেত্রীকে সাথে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৬ দফার বই বিলি করেছেন।

সাহারা আপা সাজেদা আপার মরিচা ভবনে রাইফেল চালানোর ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। ঔষধ, খাবার ও জামা-কাপড়ও সরবরাহের কাজ করেছেন আপা।

দেশ স্বাধীনের পর আপার পিতা মরহুম আবদুল আজিজ মাষ্টার নিজের বন্দুকটি বের করে সাহারা আপার হাতে দিয়ে বলেছিলেন- আকাশে গুলি ছুড়ো। সবাইকে জানিয়ে দাও আমরা স্বাধীন, বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অভিনন্দন জানাও। সাহারা আপাও ‘জয় বাংলা’ বলে বন্দুকের গুলি ছুড়েছিলেন।

১৯৭৩ সনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পূর্ব-জার্মানে এক যুব সম্মেলনে ৭০/৭৫ জনের এক প্রতিনিধিদলে সাথে সাহারা আপাকেও পাঠান,যেই প্রতিনিধি দলে ছিলেন ফণিভূষণ মজুমদার, শেখ ফজলুল হক মণি, শেখ কামাল, সুলতানা কামালসহ অনেকে। সেদিন বঙ্গবন্ধু তাঁদের কিছু নির্দেশনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছো, তোমরা শৃংখলা বজায় রাখবে, ভাল আচার-আচরণ করবে। যাতে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল হয়। এটিই ছিল সাহারা আপার প্রথম রাষ্ট্রীয় বিদেশ সফর।’
সর্বশেষ ১৯৭৫ এর ১৭ই মার্চ বাংলাদেশ মহিলা সমতির পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে কেক নিয়ে যান ধানমন্ডি ৩২ নং বাড়ীতে, বঙ্গবন্ধু কেক কাটলেন, আপার হাতে দিয়ে বললেন সবাইকে দাও। সেই দিনই ছিল বঙ্গবন্ধুর সাথে সাহার আপার শেষ দেখা।

১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্ট জাতির জনকের স্বপরিবারে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকান্ডের পরও সাহারা আপা আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে সরে আসেননি, নির্দেশনা নিয়েছেন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর কাছ থেকে।

বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সনে দেশে ফিরে আসেন, তখন বঙ্গবন্ধু কণ্যার সহযোদ্ধা হয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ সকল আন্দোলন সংগ্রাম এবং আওয়ামীলীগের সাংগঠিক কার্যক্রমে সাহারা আপা নিরলসভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন।

সাহারা আপা ১৯৯১ সনের সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন ঢাকা-৫ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সাথে প্রতিদ্বন্তিতা করেছিলেন কিন্তু ভোট কারচুপি করে তাঁকে হারিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২০০৮ সনের ২৯ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসন থেকে মনোনয়ন পেয়ে বিপুল ভোটে জয় লাভ করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাহারা আপা।

এই বৈষয়িক মহামারিতে আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে কি করা যায়, দলীয়ভাবে কি করা যায়, অনেক বিষয়েই কথা গেল বছরও কথা হয়েছে আপার সাথে। শেষ বার কথা হলো ২৪ মে ঈদের দিন, আপা ঈদ মুবারক বলে মৃদু স্বরে বললেন, ‘শরীরটা ভালো না, আল্লাহ যে কয়দিন এই দুনিয়ায় রাখবে!’ আমি বললাম, ঠিকমতো ঔষধ খান সুস্থ হয়ে যাবেন। আমার মেয়ে নামিরার সাথেও আপা কথা বললেন, আমি ভাবতেও পারিনি সেই দিন ছিল সাহারা আপার সাথে আমার শেষ কথা। আপা যখন হাসপাতালে ভর্তি শরীর খুব খারাপ, তখনও নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আব্দুল্লাহ এসেছে, লিনা এসেছে? এ-খবর শুনার পর আমি ছুটে গিয়েছিলাম হাসপাতালে।

উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়াসহ সবচেষ্টাই করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু মহান আল্লাহ হুকুমের কাছে হার মানলেন সবাই। ৯ জুলাই ২০২০ তারিখে শ্রদ্ধেয় সাহারা আপা চিরবিদায় নিলেন।

সাহারা আপা নিজেকে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু কণ্যার বিশ্বস্ত কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন।
আইনঙ্গনে মুজিব আদর্শের হাজারো নেতাকর্মী তৈরির কারিগর তিনি। আইনজীবীদের রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মূল কারিগরই ছিলেন আমাদের আপা।

তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল এবং অনুগত থেকে আজীবন আওয়ামীলীগের হয়ে দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি বহুবার নির্যাতিত হয়েছেন, জেল খেটেছেন, তারপরও তিনি কখনো থেমে থাকেননি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠায় কাজ করে গেছেন এবং আমাদের মতো হাজারো কর্মী বঙ্গবন্ধু কণ্যার জন্য রেখে গেছেন। কর্মীবান্ধব নেত্রী সাহারা আপার শ্রম ও ত্যাগ বৃথা যাবে না। আল্লাহ শ্রদ্ধেয় সাহারা আপাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান করে রাখুন, আমীন।

আমার প্রতি আপার যে স্নেহ, ভালোবাসা, আস্থা, বিশ্বাস কোনটার অমর্যাদা আমি হতে দেয়নি, ভবিষ্যতেও দেবো না। সাহারা আপা মানুষটাই এমন… যিনি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে কখনও বেঈমানী করতে শিখেন নি। কি পেলাম আর কি পেলাম না, সেই হিসেব কখনও তিনি করেন নি। রাজনীতি ভোগের নয় বরং ত্যাগের, যার উদাহারণ আমাদের সাহারা আপা।

‘সাহারা’ আপার মতো সৎ, নিরলস-পরিশ্রমী, কর্মীবান্ধব এবং এত বড় ত্যাগী একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদের কথা নতুন প্রজন্মের কাছে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা থেকে আমার এই প্রয়াস।

বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে বলছি, এডভোকেট সাহারা খাতুন, একজন কিংবদন্তি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মতো মুজিব প্রেমীর মাঝে।

লেখক: আইনজীবী ও সাবেক সদস্য, আইন বিষয়ক উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here