শিল্পী নিজেই একটা পৃথিবী, যার পৃথিবী সে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে : বাপ্পি  খান

0
145
তরুণ নির্মাতা বাপ্পি খান

বাপ্পি খান, তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা। জন্ম এবং বেড়া ওঠা গোপালগঞ্জে। এরপর সিনেমার টানে ঢাকায় ছুটে আসা। বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, টিভি নাটক এবং মিউজিক ভিডিও নির্মাণের পর তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সোলমেট-এর শ্যুটিং শেষ করেছেন। এখন চলছে শ্যুটিং পরবর্তী ধাপের কাজ। সোলমেট, ক্যারিয়ারের শুরুর কথা সহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এল আলাপচারিতায়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মোহাম্মাদ জাকারিয়া।

আজ সারাবেলা:  কেমন আছেন?

বাপ্পি খান: জি, ভালো আছি।

আজ সারাবেলা: আপনার নতুন ছবি সোলমেটের কাজ কতদূর এগোল?

বাপ্পি খান: শ্যুটিং শেষ তবে একটা দৃশ্য রিশ্যুট করব যদি সুযোগ পাই, কারণ দৃশ্যটা তাসকিন (তাসকিন রহমান) ভাইয়ের, উনি এখন দেশের বাইরে আছেন। এছাড়া এখন পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ চলছে। সামনে মাস থেকে ডাবিংয়ের কাজ শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।

আজ সারাবেলা: সোলমেট কোন ঘরানার ছবি, মানে জনরা কী? সোলমেটে এমন কী আছে যা দেখে দর্শক মুগ্ধ হবে ?

বাপ্পি খান: সোলমেট রোমান্টিক থ্রিলার জনরার মুভি। সিনেমাটা শুরু থেকে শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবাই একটা ঘোরের ভিতরে থাকবে। কী হচ্ছে বা কী হবে আগে থেকে আন্দাজ করতে পারবে না। সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সিনেমাতে ভিলেন নিয়ে একটা চমৎকার কনফিউশন থাকবে সবার। এক কথায় একটা সুন্দর গল্প! গল্পই মাত করে দেবে সবাইকে।

আজ সারাবেলা: সোলমেট চলচ্চিত্রের বিভিন্ন চরিত্রে কে কে অভিনয় করেছেন?

বাপ্পি খান: সাঞ্জু জন, বিপাশা কবির, তাসকিন রহমান, শিমুল খান, সঞ্চিতা দত্ত, মুন, ডন, আশরাফুল আসিস, ফরহাদ লিমন।

সোলমেট ছবির শ্যুটিং চলাকালীন তাসকিন রহমান এবং বাপ্পি খান ( বা থেকে)

আজ সারাবেলা: ছবি মুক্তির ব্যাপারে কী ভেবেছেন, মানে কীভাবে রিলিজ করতে চান।

বাপ্পি খান: দু’টো ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সাথে কথা হচ্ছে। এখনও ফাইনাল হয়নি। তাই এ বিষয়ে আর কিছু বলতে পারছি না।

আজ সারাবেলা: তরুণ নির্মাতা হিসেবে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ইন্ড্রাস্ট্রির জন্য কতটা ভালো বলে মনে করেন। এখন প্রখ্যাত পরিচালকরাও ওটিটিতে প্ল্যাটফর্মে সিনেমা রিলিজ দিচ্ছেন। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সুবিধা গুলো কী কী?

বাপ্পি খান: ওটিটি অবশ্যই আমাদের ইন্ড্রাস্টির জন্য একটা ভালো মাধ্যম কারণ আমাদের এখানে সিনেমা হল নিয়ে একটা বাজে পলিটিক্স আছে। ধরুন বাইরে প্লেট ঝুলছে সিনেমা হাউজ ফুল, কিন্তু প্রযোজক বলছেন লস হয়েছে, কারণ সে টাকাটা পাচ্ছেনা। ওটিটিতে সেই সুযোগটা নেই। যখন একটা মানুষ জানবে যে তার টাকা উঠে আসবে তাহলে সে অবশ্যই ইনভেস্ট করতে চাইবেন।

আজ সারাবেলা:  এটাই আপনার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি, এর আগে আপনি নাটক বানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত মোট কতগুলো নাটক বা টেলিফিল্ম এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য বানিয়েছেন?

বাপ্পি খান: জি, এটা আমার প্রথম ছবি। এর আগে নাটক বানিয়েছি ২০টা, শর্ট ফিল্ম করেছি প্রায় ২০০ তো হবেই, বিজ্ঞাপন করেছি অনেক গুলো। তাছাড়া বেশ কয়েকটা মিউজিকাল ফিল্মও করেছি।

আজ সারাবেলা: আপনার জীবনের প্রথম কাজ ছিল কোনটা?

বাপ্পি খান: আমার জীবনের প্রথম কাজ ছিল একটি অনলাইন ড্রামা, নাম “আমার গল্প”। এটা স্পেনের একটা প্রোডাকশন হাউজের কাজ ছিল আর প্রথম টেলিভিশন প্রোডাকশন ছিল “গুড মর্নিং”।

বিপাশা কবির, বাপ্পি খান এবং সাঞ্জু জন ( বা থেকে )

আজ সারাবেলা: আপনার মেকিংয়ের হাতেখড়ি হয়েছে কোথায়? মানে আপনি কি কারও সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন, না কি নিজে নিজেই শিখেছেন?

বাপ্পি খান: না কারও সহকারী হয়ে কাজ করা হয়নি কখনো। আমি নিজেই শুরু করেছিলাম এখনও করছি। বলতে পারেন নিজের কাজ থেকেই প্রতিনিয়ত শিখছি।

আজ সারাবেলা: চলচ্চিত্রকে আপনি কী হিসেবে দেখেন বা চলচ্চিত্র আপনার কাছে কী?

বাপ্পি খান: চলচ্চিত্রটাকে আমি মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি বলে মনে করি। কারণ একটা মানুষের ভিতরে অনেকগুলো মানুষ বাস করে এবং একজন মানুষ যতদিন বেঁচে থাকেন তার ভিতরে ক্ষোভ ,আক্ষেপ, ভালো লাগা, মন্দ লাগা, চাওয়া, পাওয়া কিংবা না পাওয়া এগুলো রয়ে যায়। যেমন কখনো তার কাছে মনে হয় আমি যদি ডাক্তার হতাম তবে ভালো হতো। আবার কখনো মনে হয় অন্য কিছু হলে জীবনটা সুন্দর হতো। কিন্তু আশি ভাগ মানুষই জীবনে যা হতে চায়নি সেটাই হয়েছ। কিন্তু সে সুযোগ পেলেই তার নিজের ভিতরে একটা প্রতিচ্ছবি তৈরি করে কল্পনার জগতে হারিয়ে যায়, নিজেকে সে-ই চরিত্রে অনুভব করে, আর আমরা সেই গল্প গুলো নিয়েই চলচ্চিত্র বানাই, তাই আমার কাছে চলচ্চিত্র মানে জীবনের প্রতিচ্ছবি।

আজ সারাবেলা: আপনি ইতোমধ্যে বেশ কাজ করেছেন, মানে পরিমাণের দিক থেকে। শিল্পীর কাছে তার সব কাজই সমান, সব কাজই শিল্পী সমান দরদ দিয়ে করেন। তবুও একটি দুটি বা কিছু কাজ আলাদাভাবে আলোচনায় আসে, আপনার নিজের কোন কাজটি দর্শক বেশি পছন্দ করেছে?

বাপ্পি খান: নিশ্চুপ কাজটি সবাই খুব পছন্দ করেছিল, আমার নিজেরও কাজটা ভালোলাগে। এছাড়া বাড়ি ফেরা, টান, আমার গল্প- আরও অনেক কাজ আছে যা দর্শকদের খুব পছন্দের।

আজ সারাবেলা: বলা হয়ে থাকে শিল্পের পথ অনেক সংগ্রামের। আপনাকে কী কী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে?

বাপ্পি খান: শুরু থেকেই তো নানান সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই পথ পাড়ি দিচ্ছি বলতে পারেন এখনো সংগ্রাম করেই যাচ্ছি।

আজ সারাবেলা: দু’একটা কি শেয়ার করা যেতে পারে?

বাপ্পি খান: একটা ঘটনা শেয়ার করি। অনেকদিন আগে হাতে কোনো কাজ ছিল না। রোজ একটা দুইটা মিটিং করেই যাচ্ছি, কিন্তু হবে হচ্ছে এমন করে কোনোটাই হচ্ছেনা। এদিকে বাসা ভাড়া বাকি। সব মিলিয়ে টিকে থাকাটাই অনেক কষ্টের হয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ এক বড় ভাই ফোন দিলেন, উনি একটা প্রোডাকশন করবেন, মিটিং করতে হবে উত্তরায়, কিন্তু যাওয়ার ভাড়াটাও ছিল না। তারপর মগবাজার থেকে হাঁটা শুরু করলাম  সহকারীকে সাথে নিয়ে। উনি অবশ্য সেদিনই প্রোডাকশনের টাকা দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা পেয়ে আবারও হেঁটে এসেছিলাম। কারণ একটাই, টাকা পেলে মানুষ বদলে যায়, আমি যেন বদলে না যাই (হাসি)। তবে আমার সিনেমা শুরুর আগেও এমন একটা সময় এসেছিল, ভাবছিলাম আমাকে দিয়ে আর কিছুই হবে না। আই হ্যাভ টু গো মানে সুইসাইড করার প্লান করেছিলাম। কিন্তু সেটা আর করা হয়নি। বরং মৃত্যু পথের যাত্রী  নামে একটা গল্প লেখেছি যা এখন পর্যন্ত আমার লেখা সেরা গল্প ।

আজ সারাবেলা: সংগ্রাম বলতে কি শুধু পায়ে হেঁটে যাওয়া বা একবেলা না খেয়ে থাকা এসবই? সংগ্রাম তো নানা ধরনের হয়, এই যেমন আমাদের অভিভাবকেরা সহজে চান না সন্তানেরা শিল্প মাধ্যমের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় যাক। তাছাড়া ইন্ড্রাস্ট্রিতে নতুনদের জায়গা ছেড়ে দিতে চান না পুরনোরা। বাজে পলেটিক্স-এসব বিষয়ে কী কী সংগ্রাম বা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে সেগুলো যদি বলতেন…

বাপ্পি খান:  বুঝতে পেরেছি আপনার কথা। আমি কিন্তু সিনেমার টানে বাড়ি থেকে মানে গোপালগঞ্জ থেকে পালিয়ে আসি ঢাকায়। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। এরপর শুরু হয় নতুন এক জীবন। কিছুদিন থিয়েটার করেছি। এরপর নানা জনের কাছে গিয়েছি, কারও সাপোর্ট পেয়েছি, কারও পাইনি। কিন্তু ওসব নিয়ে আমার কোনো দুঃখ বা আফসোস নেই। তাছাড়া এই সংগ্রামের কথাগুলো অল্প কথায় বোঝানো সম্ভব নয়।

আজ সারাবেলা: চলচ্চিত্র ইন্ড্রাস্টির সার্বিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। কিন্তু এক সময় চিত্রটা উল্টো ছিল। ছবি নির্মাণের সংখ্যা বেশি ছিল। সিনেমা হল বেশি ছিল। এখন সার্বিকভাবে কমে এসেছে যেমন নির্মাণ সংখ্যা তেমনি হলের সংখ্যা। কালেভদ্রে দু’একটা ছবি ব্যবসা সফল হচ্ছে। কিন্তু বাকি গুলো খরচের টাকাও তুলে আনতে পারছে না। এসব বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?

বাপ্পি খান: আমাদের এখানে অনেক ভালো মেধাবী নির্মাতা আছেন, গল্পও রয়েছে প্রচুর, কিন্তু আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে আসলে প্রোফেশনাল প্রযোজক নেই। যারা আসলে সিনেমাটা বোঝে সিনেমা বিজনেসটা জানে তাদের সংখ্যা কমে গেছে। এখন যারাই ছবি করছেন তারা কেউ শখে, কেউ কেউ হয়তো অন্য কোন কারণে। রেগুলার ছবি করার মন মানসিকতা নিয়ে কেউ ফিল্মে আসছে না। তাছাড়া আর একটা ব্যাপার, আপনি দেখবেন আমাদের সিনেমা যদি খারাপ হয় সবাই পরিচালককে দোষ দেয়, কিন্তু এই পরিচারকরা আছেন বলে সিনেমাটা এখনও টিকে আছে। আপনি যদি অন্যান্য দেশ গুলোতে খোঁজ নেন তাহলে দেখবেন সেখানে পরিচালকের কাজ হচ্ছে সুন্দর ভাবে গল্পটা বলা মানুষের সামনে তুলে ধরা, প্রযোজকের কাজ হচ্ছে সেটা দর্শকমহলে নিয়ে আসা এবং বিজনেস করা। কিন্তু আমাদের এখানে একজন মানুষকেই সব করতে হয় এটাও একটা কারণ বলতে পারেন। সিনেমা পতনের একটা কারণ। এই সমস্যা থেকে বের হতে হলে সিনেমাতে প্রচুর মেধাবী প্রযোজক আসতে হবে যারা সিনেমাটা বোঝেন, বিজনেসটা জানেন। তাছাড়া নির্মাতাদের সুযোগ দিতে হবে নতুন গল্পও বলার রিস্ক নিতে হবে। ধরাবাঁধা গল্প নায়ক-নায়িকা প্রেমের গল্পের বাইরেও গল্প বলতে হবে। কারণ এখন সবাই পুরো পৃথিবীর সিনেমার সাথে আমাদের সিনেমাকে তুলনা করেন, তাই ভালো গল্প, ভালো প্রযোজক এবং ভালো শিল্পীর কোনো বিকল্প নেই।

আজ সারাবেলা: শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম থেকে চলচ্চিত্রকে কেন আপনার আলাদা মনে হয়? চলচ্চিত্রের শক্তিশালী দিকগুলো সমন্ধে যদি বলতেন…

বাপ্পি খান: ওয়েল, দেখুন উত্তরটা কে কেমন করে নেবে আমি জানি না। তবে আমি একটু ভিন্নভাবে যদি আপনাকে বলি, ধরুন আপনি রাজনীতি করেন, আপনার মিছিলের জন্য ১০০ লোক দরকার। কেউ কিন্তু আপনাকে ভালোবেসে আপনার মিছিলে যোগ দেবে না। হাতে গোনা কিছু মানুষ ছাড়া বাকিদেরকে আপনার টাকা দিয়ে নিতে হবে এবং আপনি যখন বক্তব্য দেবেন তখন কিন্তু তারা কেউ আপনার কথা গুলো শুনবে না। সময়ের অপেক্ষা করবে কখন আপনার প্যাঁচাল শেষ হবে। কিন্তু পৃথিবীতে দুইটা মাত্র মাধ্যম আছে যা সব মানুষকে এক করতে পারে এক হচ্ছে খেলাধুলা আর দুই হচ্ছে সিনেমা। তাছাড়া সিনেমা হচ্ছে মানুষের বিবেক, মানুষের প্রতিচ্ছবি, এর থেকে শক্তিশালী দিক আর কি হতে পারে? এবং একজন শিল্পী হচ্ছেন নিজেই একটা পৃথিবী যার পৃথিবী সে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন।

আজ সারাবেলা: পরবর্তী কাজের পরিকল্পনা …

বাপ্পি খান: আসলে আমি ফিল্মই করতে চাই তবে লড়াইটা তো অনেক কঠিন, তাই টিকে থাকার জন্য এই মুহূর্তে সব কাজই করছি। নতুন দুইটা সিনেমার গল্প রেডি আছে। প্রযোজকদের সাথে কথা চলছে, লক হলেই শুরু করতে পারব।

আজ সারাবেলা: আপনাকে ধন্যবাদ।

বাপ্পি খান : আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগল।

 

আজসারাবেলা/এমজে/সাক্ষাৎকার 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here