আঁ সার্তে রিগা : তোমার দেখার চোখটা ভিন্ন

0
129

মোহাম্মাদ জাকারিয়া:
সম্প্রতি আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ পরিচালিত ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রটি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ‘আঁ সার্তে রিগা’ বা ‘Un Certain Regard’ বিভাগে অফিসিয়ালি নির্বাচিত হয়েছে। আঁ সার্তে রিগা মানে হলো, ‘ভিন্ন দৃষ্টিকোণ’ বা আরো সহজ করে বললে, নতুন চোখে দেখা। যে-গল্পগুলো বিরল, অস্বাভাবিক এবং অপ্রচলিত সে-গল্পগুলোই স্থান পায় ‘আঁ সার্তে রিগা’ বিভাগে। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ প্রথম কোনো বাংলাদেশি চলচ্চিত্র, যেটি কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৪তম আসরে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য, বাংলা ছবির জন্য দারুণ খবর—নিঃসন্দেহে।

বাংলাদেশের উত্তরসূরি বা আগামী প্রজন্মের দিকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা দৃষ্টিকোণ কী? নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিই বা কেমন? সেদিকে কি আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম দৃষ্টিপাত করছে? কেউ যদি বলেন, নতুনদের আবার দৃষ্টিভঙ্গি কী? ওরা তো চোখ মেলে ঠিকমতো খোলা আকাশটাই দেখতে পারছে না, ওরা তো চোখ আটকে রেখেছে মোবাইলের পর্দায়।পাবজি, ফ্রি ফায়ার খেলে খেলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খুব যৌক্তিক কথা। চার দেয়ালে বন্দি থাকলে খোলা আকাশ দেখবে কেমন করে? এর জন্য দায়ী কে বা কারা?

অতি সম্প্রতি এমন একটি খবর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, ফ্রি ফায়ার, পাবজি, টিকটক জ্বরে আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীকে দোষারোপ করার বিষয়টি। অতিরিক্ত গেমাসক্তি ভালো কথা নয়। মননে, চিন্তায়, ভাবনায় প্রভাব ফেলে। অবশ্যই আমি এই আসক্তির বিপক্ষে। কিন্তু নতুনদের জন্য আমরা কতটা করেছি, ভেবেছি? নতুনেরা যদি প্রশ্ন করে, রাস্তায় কেন তাদের ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে বসে কাটাতে হয়? এই পরিকল্পনা তো আমরা করিনি। অপরিকল্পিত নগরীর নকশা বা ডিজাইন কারা করেছে? ঠিক মতো আকাশটাও দেখা যায় না। নদী, খাল ভরাট করে বাড়ি, বাজার কারা বানিয়েছে? আমরা তো বানাইনি। আমাদের খেলার মাঠ কই? যেখানে গিয়ে আমরা সারাটা বিকেল ঘাম ঝরিয়ে ফুরফুরে মেজাজে সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরব! আমাদের প্রতিদিনের পড়া তো স্কুলেই শেষ হওয়ার কথা, তবে কেন সকাল-সন্ধ্যা-রাতে বাসায় হাউজ টিউটরের আগমন?

আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের অভিভাবকেরা কী জবাব দেবেন? পারিবারিক লাইব্রেরির চল আমাদের কয়টা পরিবারে আছে? অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, অনেক অভিভাবক আছেন যারা পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়াকে ‘সময় নষ্ট’ মনে করেন (!) অনেক উপজেলায় ভালো একটা লাইব্রেরি পর্যন্ত নেই। শুধু শহর নয় গ্রামের অনেক স্কুলেও এখন খেলার মাঠ নেই। কিন্তু দু’তিনটা বহুতল ভবন ঠিকই আছে—যা প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত। অবসর সময় কাটানোর সবচেয়ে ভালো পন্থা হচ্ছে ‘বই পড়া’। আপনি একটা ভালো বই উপহার দিয়ে কখনো বলেছেন, বইটা পড়ে দেখ, মজা পাবে। সাংস্কৃতিক চর্চা তো বলতে গেলে কবরে! সিনেমা হলে ওদের যাওয়া যাবে না, চল্লিশ বছরের নায়ক-নায়িকাদের গল্পের সাথে ওদের মিশে যেতে হয়; নাটক, সিনেমায় ওদের নিজেদের কোনো গল্প নাই। দেশে এত টেলিভিশন কিন্তু কয়টা টেলিভিশনে তাদের উপযোগী অনুষ্ঠান আছে? থাকলেও নাম মাত্র।
ওরা করবেটা কী?
যে-ছেলেটা বা যে-মেয়েটা ভালো গুগলি ছুঁড়তে পারে তাকে কখনো বলেছেন, সাবাস, পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত প্রাকটিস কর, আরো ভালো করবে, তোমার মধ্যে ভালো স্পিন বোলিংয়ের সম্ভাবনা আছে। যে ভালো আঁকতে পারে তাকে বাহবা দিন, যে ভালো নাচতে পারে তাকে বলুন, নৃত্য মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। নৃত্য খারাপ কিছু নয়। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, সরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও আমাদের গ্রাফিক্স ডিজাইনার দরকার, আমাদের প্রোগ্রামার দরকার, আইটি বিশেষজ্ঞ দরকার, ফিল্মমেকার, সঙ্গীতশিল্পী, সাহিত্যিক, আলোকচিত্রী, বিজ্ঞানী, গবেষক দরকার। জিপিএ ফাইভের নামে ওদের ঘাড়ের উপর চেপে বসেছেন। কারণ একটাই : ভালো রেজাল্ট মানে বেশি টাকা ইনকামের রাস্তা। আমি আপনি কেন তাদেরকে টাকা কামানোর হাতিয়ার বানাচ্ছি? মেধাবী হতে গেলে জিপিএ ফাইভ পাওয়া লাগে না। মুখস্থ করে ভালো রেজাল্ট করা, আর ভালো মানুষ হওয়া দুটো আলাদা কথা। বাংলাদেশে এমন বহু প্রতিভা আছে যারা ক্লাস এইট পাস করে বা জিপিএ ফাইভ না পেয়েও আস্ত একটা উড়োজাহাজ বানিয়ে ফেলেছে। সে বা তারা কি মেধাবী নয়? আমার কাছে তো তারা ‘ডাবল মেধাবী’। প্রতি বছর ভালো রেজাল্ট করে এই যে এত এত ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-বিসিএস ক্যাডার হচ্ছে দেশটা কেন তবে ‘স্বপ্নপুরী’ বা ‘স্বর্গপুরী’ হচ্ছে না, বা দেশে কেন এত দুর্নীতি? তবে আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কী শেখাচ্ছে? মুখস্থ করে ভালো রেজাল্ট করা, আর ভালো মানুষ হওয়া বা মানবিক হওয়া দুটো আলাদা কথা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মানবিক গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে ব্যর্থ। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আরেক নাম ডিগ্রি বা সনদ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান।

নিজেদের দোষ স্বীকার না করে নতুন প্রজন্মকে দোষ দেওয়াটা এক প্রকার নিজেদের দোষকে আড়াল করার শামিল। অনেক অভিভাবক ‘সন্তানের ভালোর জন্যই তো করি’—কথাটা বলে থাকেন। সন্তানের ভালোর জন্য তার বন্ধু হন, তার ভেতরে যে সুপ্রবৃত্তিগুলো আছে সে-গুলোকে মেলে ধরতে সহায়ক হন। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকারী হবেন না। নিয়ন্ত্রণ মানেই খবরদারি। ‘খবরদারি’ শব্দটা মোটেও ভালো শোনায় না। অতিরিক্ত খবরদারি বাচ্চাদের জন্য মানসিক অবসাদ, বিকৃতি ছাড়া কিছু উপহার দিতে পারে না। এতে তারা হয়ে উঠছে আরো ক্ষিপ্র, আশ্রয় নিচ্ছে মাদকের, তৈরি করছে ‘কিশোর গ্যাং’। কেননা, আপনি আর আপনার সন্তান দুজন দুটো আলাদা সত্ত্বা। এ বিষয়ে কাহলিল জিবরান তাঁর দ্য প্রফেট গ্রন্থে বলেছেন, ‘তোমরা তাদের দেহকে ঘরে রাখতে পারো, কিন্তু তাদের আত্মাকে ধরে রাখতে পারো না। কারণ তাদের আত্মার বসবাস ভবিষ্যতের গৃহে, তোমাদের স্বপ্নেও তোমরা সে গৃহের সন্ধান পাও না’।

এই প্রজন্মের পালস বুঝুন। তারাই তো জাতির ভবিষ্যৎ। তারাই তো জাতির মেরুদণ্ড। এত শত বোঝা চাপিয়ে দিলে তারা মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবে কী করে? গেমাসক্তি, মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং ঠেকাতে গেলে প্রয়োজন সুস্থ চর্চা, ভালোর চর্চা। তরুণদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকেই করতে হবে। কেননা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তরুণরা চালায় না।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনির্মাতা

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here