রোজিনা ইসলামের মুক্তি চাই

0
209

জুলহাস আলম:
সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম দেশকে ভালোবাসেন। রোজিনা আমাদের বন্ধু, আমরা একই ব্যাচের শিক্ষার্থী।

একবার আমাকে নক করে বললেন: ‘জুলহাস ভাই, বিদেশে যাবার জন্য আপনার কাছ থেকে একটা রিকমেন্ডেশন লাগবে, যদি সম্ভব হয় তাহলে কৃতজ্ঞ থাকবো।’

আমি ভাবলাম হয়তো বিদেশ চলে যাবেন একেবারে। অনেকেই যাচ্ছেন। তাতে দোষের কিছু নেই।

উত্তরে রোজিনা বললেন: ‘না, না ভাই, নর্থ আমেরিকায় সাংবাদিকতার উপর একটা স্কলারশিপের চেষ্টা করবো, সেজন্য একটা রিকমেন্ডেশন দরকার, আপনার কাছ থেকে পেলে ভালো হয়।’

বললাম: ‘কোনো সমস্যা নেই, অবশ্যই দিব।’

তার বক্তব্যে পরিষ্কার আবেগ ছিল, তিনি দেশকে ভালোবাসেন। বলছি না যে, কেউ বিদেশে চলে গেলে তিনি দেশকে ভালোবাসেন না। আমার কাছে মনে হয়, দেশের মধ্যে বিদ্যমান সকল অরাজকতা, অন্যায়, দুর্নীতি, যা ইচ্ছা তাই থাকার পরও; এমনকি বাইরে চলে যাবার সুযোগ থাকার পরও যারা এখানেই পড়ে থাকতে চান। থাকেন। তারা একটু বেশিই দেশপ্রেমিক। রোজিনাও সেই দলেই পড়েন। আগুনের কুণ্ডলির মাঝখানে আটকা থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা সহজ কাজ নয়।

তাছাড়া নারী হয়ে এমন শক্তভাবে সাংবাদিকতা করার সাহস দেখানো এতো সহজ নয়। দুই একটা হুমকি ধামকিতেই গুটিয়ে যাবার কথা। রোজিনা কখনো দমে গেছেন বলে আমাদের জানা নেই। তার সকল চেষ্টা প্রশাসনের বড় কর্তাদের নানা অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির ভেতরে আঘাত করা। জনগণের সামনে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সেটাকে তিনি দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন। তার যে সাহস সেই সাহস আমাদের অনেকের আছে কি না সন্দেহ আছে আমার।

সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম প্রশাসনের অনেক কর্তাব্যক্তির কমফোর্ট জোন এলোমেলো করে দিয়েছেন এ পর্যন্ত। দুর্নীতির দুষ্টচক্র ও অসাধু ঠিকাদারদের কাছে তিনি চক্ষুশূল হবারই কথা। কিন্তু তার কাজের ফলে আমার ধারণা সবচেয়ে বেশি সুবিধা হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর।

রোজিনার অনেকগুলো প্রতিবেদনের কথা চোখ বন্ধ করলেই মনে করতে পারি। পাঁচজন সচিবের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেয়া তার মধ্যে একটি। সম্প্রতি তিনি ৩৫০ কোটি টাকার স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনা নিয়ে ভালো রিপোর্ট করেছেন, নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য বিষয়ে রিপোর্ট করেছেন। লেগে আছেন ভ্যাকসিন নিয়ে কী হতে যাচ্ছে তার পেছনে। কারণ এসবের সাথে জনগণের ট্যাক্স দিয়ে কেনা কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন সংগ্রহের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা চাওয়ার অধিকার জনগণের আছে। কারণ, বোঝা যায় করোনা পৃথিবীর জন্য দুর্যোগ হলেও কতিপয়ের পোয়াবারো হয়েছে তাতে।

তাই যারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চোখের সামনে পর্দা তুলে রাখতে চান যেনো সবকিছু তিনি দেখতে না পান, জানতে না পারেন, তারা একজন রোজিনা ইসলামকে সহ্য করতে পারবেন না, সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? তাই তাকে শায়েস্তা করতে না পারলে বড় বড় নানা দুর্নীতির অভিযোগে নিমজ্জিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সেই দুষ্টচক্র শান্তি পায় কি করে?

করোনা শুরু হবার পর থেকে এই মন্ত্রণালয় নিয়ে যত রকমের খবর বেরিয়েছে সেগুলোর পোস্টমর্টেম করলে-তো আর কিছুই বাকি থাকে না। তবে আতংকের বিষয় হলো, মনে হচ্ছে রাজনৈতিক অথরিটি তাদের সহনশীলতা ও গুড জাস্টিস দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এটা শংকার কারণ হতে পারে। যে কোনো পরিস্থিতিতেই রাজনৈতিক অথরিটির ম্যাচিওরিটি আশা করে জনগণ। তা না হলে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি যে হয় তার বহু উদাহরণ আছে।

নিউ ইয়র্কভিত্তিক কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজে এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, অফিসিয়াল সিক্রেটস এক্ট এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্টকে অপব্যবহার করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এটা একটা শক্ত হাতিয়ার। প্রশাসনের কেউ ক্ষুব্ধ হলে এগুলোকে ব্যবহার করছে দেদারসে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক প্রতিবেদনে বলছে, গত বছর অন্তত ২৪৭ জন সাংবাদিক হয়রানি, আক্রমণ বা ইন্টিমিড্শনের শিকার হয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং অন্যদের দ্বারা। এছাড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্টের আওতায় নয় শতাধিক মামলা হয়েছে এবং প্রায় এক হাজার অভিযুক্তের মধ্যে ৩৫৩জনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে অনেকেই হলেন সাংবাদিক।

রোজিনাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনজীবীরা বলছেন, বৃহস্পতিবার পরবর্তী শুনানি হবে জামিন নিয়ে। যে কোনো পরিস্থিতিতে কারাগারের ভেতরে থাকা রোজিনা এবং বাইরে থাকা পরিবারের উপর যেনো কোনো প্রকার চাপ তৈরি করা না হয় সেজন্য জোরালো দাবি জানাচ্ছি।

সাংবাদিকতায় পেশায় নিয়োজিত এবং পেশার বাইরে অগণিত মানুষের মতো আমিও রোজিনার মুক্তি চাই অবিলম্বে, কোনো শর্ত ছাড়াই।

লেখক: ব্যুরো চিফ, এপি

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here