লকডাউন নিয়ে সংঘর্ষে সালথায় একজন নিহত, পুলিশসহ আহত শতাধিক

0
32
লকডাউন নিয়ে সংঘর্ষে সালথায় পুলিশসহ আহত ৩০

সারাবেলা রিপোর্ট: ফরিদপুরের সালথায় লকডাউন চলাকালে বাজারের একটি দোকান বন্ধ করা ও সালথা উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সঙ্গে থাকা সরকারি কর্মচারীর লাঠিপেটায় এক ব্যক্তির গুরুতর আহত হওয়াকে কেন্দ্র করে উপজেলা পরিষদ, থানা ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়সহ বিভিন্ন অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছেন স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা। এ ঘটনায় উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামের জুবায়ের হোসেন (১৯ )নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এছাড়া থানার এসআই মিজানুর রহমান এবং দুই কনস্টেবলসহ শতাধিক লোক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সালথা থানার ওসি আশিকুজ্জামান।

স্থানীয়দের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় ভাঙচুর চালানো হয় সালথা উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন কক্ষে। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় কমপক্ষে তিনটি কক্ষ। আগুনে পুড়ে গেছে ইউএনও এবং এসিল্যান্ডের দুটি জিপ গাড়ি। এছাড়া উপজেলা চত্বরে থাকা পাঁচটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। হামলাকারীরা উপজেলা চত্বরে অবস্থিত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবনেও হামলা করে নির্বিচারে ভাঙচুর চালায়। হামলাকারীরা উপজেলা চত্বরের বিভিন্ন অফিস ভাঙচুরের পাশাপাশি উপজেলা চত্বরের পাশে থানায়ও হামলা করে। এছাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস ভাঙচুর করে। এসময় দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় বিক্ষুব্ধ কয়েক হাজার মানুষ।

ওসি বলেন, হামলাকারীরা উপজেলা পরিষদে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তারা ইউএনও, এসিল্যান্ড, উপজেলা চেয়ারম্যান, কৃষি দফতর, এলজিইডি, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য বিভাগের কক্ষ ভাঙচুর করে। ভাঙচুরের পাশাপাশি এসব অফিস থেকে মূল্যাবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। হামলাকারীরা তিনটি কক্ষ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। এসময় তারা উত্তেজিত জনতাকে সরিয়ে দিতে শটগানের ৬০০ রাউন্ড বুলেট, ৩২ রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস, ৭০ রাউন্ড রাইফেলের গুলি ও ২২টি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষের সময় র‌্যাব-পুলিশের ৭ সদস্যসহ প্রায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার বিকালে সালথা বাজারে একটি দোকান বন্ধ করা নিয়ে সালথা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হীরামনির সঙ্গে বাগবিতন্ডা হয় ওই দোকান মালিকের। এই ঘটনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) পুলিশ ডেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালালে দোকানদাররা পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

এছাড়া, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সালথা উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ফুকরা বাজারে চা খেয়ে ওই ইউনিয়নের নটাখোলা গ্রামের মৃত মোসলেম মোল্যার ছেলে মো. জাকির হোসেন মোল্যা বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় সেখানে লকডাউনের কার্যকারিতা পরিদর্শনে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হীরামণি উপস্থিত হন।

জাকির হোসেনের অভিযোগ, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সহকারী কমিশনারের গাড়ি থেকে নেমে এক ব্যক্তি তার কোমরে সজোরে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। এতে তার কোমর ভেঙে যায়। আহত জাকির হোসেনকে উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে জাকির হোসেন আহত হওয়ার খবরে সেখানে উপস্থিত জনতা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে আরও গ্রামবাসী জড়ো হয়। পরে সেখানে সালথা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ পৌঁছালে উত্তেজিত জনতা হামলা করে। এতে মিজানুর রহমানের মাথা ফেটে যায়। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা সালথা থানা অভিমুখে রওনা হয়ে থানা ঘেরাও করে। পরে এসব হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশ গুলি ও টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে রাত ২টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানা যায়।

সালথা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়াদুদ মাতুব্বর জানান, আমার বাসভবনসহ বিভিন্ন অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।

ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) সুমিনুর এই প্রতিবেদককে জানান, স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে ফরিদপুর ছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে পুলিশের অতিরিক্ত দল ঘটনাস্থলে আসে। তিনি বলেন, পুলিশের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এসে র‌্যাবও আক্রান্ত হয়েছে।

ঘটনার সময় থানায় নারী ও শিশুসহ সাধারণ মানুষ আটকা পরার বিষয়ে তিনি বলেন, আটকা পরা মানুষেরা আতঙ্কজনক পরিস্থিতির মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। একটা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা।

তিনি বলেন, উপজেলা অফিস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও থানায় হামলা চালানো হয়েছে। এসব স্থানে অগ্নিসংযোগ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়।

আহতদের সংখ্যা বিষয়ে তিনি বলেন, অনেকেই আহত হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত আহতদের সঠিক তথ্য পাইনি। আমরা সহনশীলতার চূড়ান্ত রূপ প্রদর্শন করেছি।

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলিমুজ্জামান বিপিএম বলেন, লকডাউনের প্রথম দিনে সরকারি নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে স্থানীয় জনতার সঙ্গে কর্মকর্তাদের ভুল বোঝাবুঝি হয়। তর্কে-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে উপজেলা পরিষদ, থানা ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবনসহ বিভিন্ন অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার্থে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসিল্যান্ড মারুফা সুলতানা হীরামনি বলেন, লকডাউন কার্যকর হচ্ছে কিনা সেটি দেখার জন্য ফুকরা বাজারে যাই। এরপর তারা আমার গাড়ি ধাওয়া করলে আমি বিষয়টি থানা পুলিশকে জানাই। এরপর স্থানীয়রা থানা ঘেরাও করে তাণ্ডব চালায়। তবে তার কোনও সহকর্মী কাউকে আঘাত করেনি বলে দাবি করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় একজন হুজুরকে মেরে ফেলা হয়েছে এই গুজব ছড়িয়ে গ্রামবাসীকে একত্রিত করে এই হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়।

এ বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, এটি পুলিশের সঙ্গে হামলাকারীদের সংঘর্ষ। এখানে সরকারি কোনও কর্মকর্তা জড়িত নন।

সংঘর্ষ থামার পর ফরিদপুর ও সালথার ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি থমথমে থাকলেও গোটা উপজেলা চত্বর জুড়ে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা টহল দিচ্ছেন।

আজসারাবেলা/সংবাদ/মাখ/সারাদেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here