রাজনীতি হোক বাংলাদেশের মৌলিক চরিত্র অনুসরণে

0
439

মোহাম্মদ এ. আরাফাত:
বাংলাদেশ এখন এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতির পথে। উন্নয়নের মহাসড়কে বেগবান দেশের যাত্রা। এখন পাকিস্তানিরাই বলছে, আমরা তাদের চেয়ে ১০ বছর এগিয়ে আছি। মজার বিষয় হলো, তারা আমাদের আগে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তারা স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে আর আমরা ১৯৭১ সালে। আগে স্বাধীন হওয়া একটি দেশ বাংলাদেশ থেকে ১০ বছর পিছিয়ে গেলো কেন? কারণ, পাকিস্তানে যে রাজনীতির চর্চা হয়েছে, সেটি আইএসআই কেন্দ্রিক, ধর্মীয় মৌলবাদকে উস্কে দিয়ে এবং ধর্মের অব্যবহার করে।

সেই রাজনীতি গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক এবং প্রগতিশীল রাজনীতি নয়। মূলত এ কারণেই ’৪৭ সালে জন্ম হওয়ার পর এখনও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে পাকিস্তান। অপরদিকে যতটুকু সময় বাংলাদেশ প্রগতিশীল রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত হয়েছে- সে সময়েই আমরা এগিয়ে গেছি।

একটা সময় গেছে বাংলাদেশেও একই পাকিস্তানি ভাবধারার সরকার দেশ পরিচালনা করেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো- স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছর পরেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে এদেশ চলা শুরু করে উল্টো পথে এবং পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত হয়েছে দীর্ঘকাল। তখন ক্ষমতায় থেকে সামরিক শাসকরা মৌলবাদি ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির চর্চা করেছে। তুলনা করলে বলতে হয়, স্বাধীনতার পর মাত্র ২০ বছর দেশ পরিচালনা করেছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ। এই সময়ের মধ্যে সামগ্রিকভাবেই পাকিস্তান থেকে ১০ বছর এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

আমরা তাদের চেয়ে ১০০ বছর এগিয়ে থাকতাম, যদি স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত পুরোটা সময় প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় দেশ পরিচালিত হতো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এক বিপরীত স্রোতে এগিয়ে গিয়েছিল রাজনীতি। ফলে দেশ এগিয়ে গিয়েও পিছিয়ে গেছে। এখন বিষয়টি খুবই স্পষ্ট, কোন রাজনীতি দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, আর কোন রাজনীতি পিছিয়েছে।

ভবিষ্যতেও যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালিত না হয়, প্রগতিশীল ভাবধারার না হয়, উন্নয়নের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, মানবতাবাদের পক্ষে, সত্যের পক্ষে না হয়, তাহলে আবারও পাকিস্তানের মতো অবস্থা হবে, পিছিয়ে যাবে বাংলাদেশ। সমৃদ্ধ ও উন্নয়নের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত সরকারের বিকল্প নেই। বিকল্প নেই- বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চেতনা ও আদর্শের।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলবাদি রাজনীতির চর্চা যখন শুরু হয় অর্থাৎ পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসকের হাত ধরে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির দিকে গেলাম, তারই ফলস্বরূপ পরে বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদ জায়গা করে নেয়।

২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াতের সময়কালে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। পরে ২০০৮ সালের শেষে মহাজোটের বিজয়ের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে ২০০৯ সালে কঠোরভাবে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। জঙ্গিবাদের বিপক্ষে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়।

সরকারি পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশে তৃণমূলের বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গিবাদের যে স্ট্রাকচারগুলো ছিলো, তা ভেঙে দেয়া হয়েছে। আবার অনেকে বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে। বৈশ্বিক বাস্তবায়তায় বাংলাদেশে যারা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে তাদের একটি বড় প্রকাশ আমরা দেখেছি হলি আর্টিজানে। তখনও সরকার সিদ্ধ হস্তে তা দমন করেছে।

এখন আমরা অনেকটা নিয়ন্ত্রিত রয়েছি বলা যায়। কিন্তু আমি মনে করি, জঙ্গি কার্যক্রমের বিপক্ষে যেমন শক্ত অবস্থান নিতে হবে, তেমনই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকেও কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে জঙ্গিবাদকে মোকাবিলার জন্য আমাদের বিভিন্ন ধরণের কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। তারই অংশ হিসেবে দেশজুড়ে ‘সুচিন্তা ফাউন্ডেশন’ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদবিরোধী কাজগুলো করে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় কমিউনিটি তৈরি করা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য হলো- যারা মাদ্রাসায় পড়ছেন তাদের অনেকেই মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সেভাবে পরিচিত নয়, সেজন্যই তাদের মূলধারার শিক্ষা কার্যক্রমে নিয়ে আসতে কাজ করছে কমিউনিটিগুলো। মূলধারায় নিয়ে এলে তাদের মধ্যে কোনো হতাশা থাকবে না। তারাও অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সব ধরণের কাজে যুক্ত হতে পারবে। কারণ এসব শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন হতাশাকে পুঁজি করে একটা গোষ্ঠী তাদের জঙ্গিবাদে উদ্ধুব্ধ করে। তাদের মধ্যে যেন এ ধরণের চিন্তা বাসা বাঁধতে না পারে সেজন্যও সংস্থাটি কাজ করছে। মূল বিষয়টি হলো, মাদ্রাসাভিত্তিক জনগোষ্ঠী ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাঝে যে দেয়াল রয়েছে তা ভেঙে ফেলা। ধর্মকে ব্যবহার করে যেন কোন ধরণের অপকর্ম কেউ করতে না পারে সেজন্য আমরা লড়াই করে যাচ্ছি।

ঢাকায়ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলেজেও এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তরুণদের মধ্যে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে একঝাঁক তরুণ। ‘জাগো তারুণ্য রুখো জঙ্গিবাদ’ শ্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে ক্যাম্পাস। করোনাকালে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও চলছে এই কার্যক্রম। তরুণরা বুঝতে সক্ষম হচ্ছে জঙ্গিবাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য কী? কেন ও কীভাবে তারা তরুণদের টার্গেটে পরিণত করে। এর নেতিবাচক দিকগুলো তারা বুঝতে পারছে, অনুধাবন করতে পারছে। ইসলামের সঙ্গে জঙ্গিবাদের যে কোন সম্পর্ক নেই, ইসলাম কোনভাবেই জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে নাÑএই বিষয়গুলো তারা উপলব্ধি করতে পারে সুচিন্তার সেমিনারের মধ্য দিয়ে। তাদের নিজেদেরও কথা বলার, মত প্রকাশের সুযোগ থাকে এসকল অনুষ্ঠানে।

জঙ্গিবাদের পেছনে থাকে রাজনীতি, ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্র। ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে, ধর্মের নামে মিথ্যাচার করে মানুষকে হত্যা যে ইসলামও অনুমোদন করে না তা তরুণদের উপলব্ধি হচ্ছে। এখনকার তরুণরা বুঝতে পারছে এর পেছনে অন্য রাজনীতি আছে, যে রাজনীতি বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয়ার রাজনীতি। যে রাজনীতি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনাবিরুদ্ধ রাজনীতি। যে রাজনীতি প্রকৃত ইসলামের বিপরীতে ধর্মান্ধতার রাজনীতি।

বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে তার মৌলিক চরিত্র আর আদর্শ অনুসরণ করে। তাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীতে আজ এটাই হোক অঙ্গীকার- রাজনীতি হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, দেশ হবে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত, নিশ্চিত হবে প্রতিটি মানুষের অধিকার।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here