মানুষ কি করে এত বিপুল বিস্তারিত জীবন জগৎ নিয়ে লিখে: মো. সাইফুর রহমান

0
369

যে সাইফুর লেখক হবেন কখনো ভাবেননি তার প্রথম বই-ই তুমুল জনপ্রিয়। লিখবার চেয়ে পড়বার গুরুত্ব তার কাছে বেশি। ফলে সাইফুর ভালো লিখবেন এমনটা প্রত্যাশিত। ইতিমধ্যে অ্যামাজন-এ তার বই বিক্রিও শুরু হয়েছে। কী লিখছেন সাইফুর? কেমন আছেন? কেমন কাটছে তার বেলা-অবেলা? নবীন তবে ঋদ্ধ লেখক সাইফুর রহমানের সঙ্গে ‘আজ সারাবেলা’র গল্প-কথা-সাক্ষাৎকার।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জব্বার হোসেন

আজ সারাবেলা: আপনার গল্পের বই ‘গুনিন’। ২৩টি গল্প রয়েছে সেখানে যার প্রতিটি বিষয়বস্তু আলাদা। তার মানে অনেক গল্প রয়েছে আপনার মধ্যে। এই যে গল্প এবং কথা; পাঠকদের জন্য এর গল্পটা যদি বলেন…

মো. সাইফুর রহমান: আরও অনেকগুলো গল্প ছিল। সেখান থেকে বাছাই করে ২৩টি গল্প বইয়ের জন্য সংকলিত হয়। বই করার কোন পরিকল্পনা ছিল না। প্রায় আড়াই বছর আগে আমি ফেসবুকে লেখা শুরু করি একটি দুটি গল্প। সাড়াও পেতে থাকি। গল্প বাড়তে থাকে। আমার বন্ধু শুভাকাঙ্খীরা আরও লিখতে বলে আমাকে। শুরুর গল্পটা অনেকটা এমন।

তবে ছেলেবেলায় আমি একটু তোতলা ছিলাম। কথা বলতে গেলেই অনেকটা এলোমেলো হয়ে যেতাম। একটা সময় কথা বলাই কমিয়ে দিলাম। তখন চারপাশ দেখতাম অনেক বেশি। মানুষকে অনেক বেশি লক্ষ্য করতাম। এটা হয়তো আমার মধ্যে মানুষকে দেখবার একটা আকাঙ্খা এবং দৃষ্টিভঙ্গি দুটোই তৈরী করেছে। হয়তো সেখান থেকেও গল্পকথার শুরু হতে পারে।

আজ সারাবেলা: সাধারণত লেখকেরা পত্র-পত্রিকা দিয়েই লেখালেখি শুরু করেন। আপনি ফেসবুককে কেন বেছে নিলেন?

মো. সাইফুর রহমান: কাস্টমসে চাকরির সুবাদে অনেক স্বর্ণ চোরাচালানের অনুসন্ধানে লিড দিয়েছি। সেখানকার অনেক ঘটনা রীতিমত বিস্ময়কর। আমি অপরাধীদের মনস্তত্ব বুঝতে চাইতাম। তাদের নাম-চরিত্র-স্থান-কাল বদল করে গল্পের মতো করে দু-একটি কাহিনী প্রথম ফেসবুকে লিখি। পাঠকরা সারা দেয়। ফেসবুকে সুবিধা হলো, তাৎক্ষনিক পাঠকের প্রতিক্রিয়া জানা যায়। একজন লেখকের জন্য পাঠকের এই প্রতিক্রিয়া জানাটা খুব জরুরী। সেদিক থেকে ফেসবুক অনেক বড় প্লাটফর্ম।

আজ সারাবেলা: আপনার গল্পে একটা ধাক্কা থাকে। কোথায় শেষ হবে সেটা আঁচ করা যায় না শুরুতে কিংবা মাঝে। গল্পের শেষটা কোথায় হবে? কেমন হবে? এটা কি আপনি আগে থেকে ঠিক করে রাখেন, না আপনি নিজেও জানেন না?

মো. সাইফুর রহমান: যে গল্পের শুরুতেই বুঝতে পারবো কাহিনী কোনদিকে যাচ্ছে, কোথায় শেষ হবে সেই গল্প নিজেও পড়তে পছন্দ করি না। সে রকম গল্প আমার নিজেরও লিখতে ইচ্ছে করে না। গল্পের শেষ পর্যন্ত যদি চম্বুকের মতো পাঠকে আটকে রাখতে না পারি তাহলে সেই গল্প লিখে লাভ কী?

আগে থেকে পুরো গল্পটা মাথায় থাকে না। হয়তো একটা থিম থাকে। সেই থিম ধরে লিখতে গেলে চরিত্র এবং কাহিনী তাদের নিজেদের মতো করে আগায়।

আজ সারাবেলা: একটা গল্প থেকে আরেকটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের গল্প, লেখকের জন্য চ্যালেঞ্জ অবশ্যই। একজন অভিনেতাও কিন্তু চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে বদলে অন্য মানুষ হয়ে ওঠে। এই যে ট্রান্সফরমেশন, একজন অভিনেতার সঙ্গে লেখকের পার্থক্যটি কোথায়?

মো. সাইফুর রহমান: লেখকের চিন্তার স্বাধীনতা অনেক বেশি। তার হাতে একটি ‘যাদুর যদি’ থাকে। সে চাইলেই অনেক চরিত্র তৈরী করতে পারে। হয়তো সে চরিত্র তাকে হতে হয় না। কিন্তু সেই চরিত্রকে দেখবার চোখ থাকতে হয়। এক থেকে অন্যে যাবার এই ট্রান্সফরমেশনটা সত্যিই কঠিন। যিনি যত ভালো পারেন তিনি তত বড় ও ভালো লেখক। অভিনেতাকে চরিত্রটা হয়ে উঠতে হয়। ধারণ করার এই বিষয়টি সত্যিই কঠিন। লেখক শুধু চিন্তায় চরিত্রটি তৈরী করেন আর অভিনেতাকে চরিত্রটি হয়ে উঠতে হয়। সেখানে তার ট্রান্সফরমেশনের চ্যালেঞ্জটা আরও বেশি।

আজ সারাবেলা: আপনার গল্পে বিষয় বৈচিত্র আছে কিন্তু সে অর্থে কোন গল্পেই প্রেম নেই। প্রচলিত প্রেম আপনার গল্পে এক অর্থে অনুপস্থিত। তবে কি আপনার নিজের মধ্যে প্রেম নেই?

মো. সাইফুর রহমান: বিষয়টি আসলে তা নয়। প্রেম আছে। তবে তার প্রকাশ ভিন্ন। প্রচলিত প্রেম নেই। সিনেমার নায়ক-নায়িকার মতো নেই। প্রকৃতির প্রতি প্রেম আছে, প্রাণীর প্রতি প্রেম আছে, পরিবারের প্রতি প্রেম আছে। অপেক্ষা নামে একটা গল্প আছে। সেখানে প্রেম এসেছে ভিন্নভাবে। সামনে আমার যে নতুন উপন্যাস ‘আংটিহারা’ আসছে। এটি রোমান্টিক থ্রিলার উপন্যাস।

আজ সারাবেলা: আপনার প্রথম উপন্যাস ‘আংটিহারা’ আসছে। ফেসবুকে পর্বকারে কিছু অংশ প্রকাশ করেছেন। সাড়াও পেয়েছেন বেশ। প্লট হিসেবে সুন্দরবনকে বেছে নিলেন কেন?

মো. সাইফুর রহমান: উপন্যাসটি লিখতে প্রায় বছর খানেক সময় লেগেছে। ‘আংটিহারা’ মূলত একটি গ্রাম। সুন্দবনের অংশই বলা চলে। আমার সুযোগ হয়েছে বনের গহীনে গিয়ে থাকার, মানুষের সঙ্গে মেশার। সেখানকার জীবন এবং জীবিকা একবারেই আলাদা। মাওয়ালী, বাওয়ালী এমনকি অন্যরাও বনবিবি’র পূজা করে। বনবিবি’র পালা আমাদের সাহিত্যেরই অংশ। অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে সেখানে গিয়ে। শুরুতে ‘আংটিহারা’ গল্প হবার কথা ছিল। কিন্তু সুন্দরবনের এত বিশাল ও বৈচিত্রতা উপন্যাসের আদল ছাড়া প্রকাশ করা কঠিন।

খুলনায় চাকরির সুবাদে আমাকে অনেকদিন থাকতে হয়েছে। মূলত সেখান থেকেই সুন্দরবনের প্রতি আমার আকর্ষণ অভিযাত্রা।

আজ সারাবেলা: এই যে আপনার সরকারি চাকরি, সাহিত্য বা লেখালেখির ক্ষেত্রে ‘এই চাকরি’ আপনার জন্য কোনো সুবিধা বা অসুবিধা তৈরী করে কি-না?

মো. সাইফুর রহমান: সরকারি চাকরির কারণে আমাকে অনেক লোকের সঙ্গে মিশতে হয়। অনেক এলাকায় যেতে হয়। সবসময় মানুষকে দেখি, মানুষের মনস্তত্ব বোঝার চেষ্টা করি। চাকরিটা আমার প্রফেশন, লেখালেখিটা প্যাশন। এখানে ক্ল্যাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর যে অবসর সময়টুকু পাওয়া যায় আমি সেই সময়টাতেই লেখি।

আজ সারাবেলা: সরকারি কর্মকর্তারা লেখক হলে পাঠকদের মধ্যে এক ধরণের টানাপোড়ন দেখা দেয়। তারা মনে করে আগে চাকুরে পরে লেখক। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

মো. সাইফুর রহমান: আমি যখন চাকরি করি তখন শতভাগ চাকুরে আবার যখন লিখি তখন শতভাগ লেখক। দুটোই আলাদা স্বত্তা। একটিকে মিলাই না অপরটির সঙ্গে। একজন সরকারি চাকুরিজীবি হয়তো ভালো গান গাইতে পারেন, ভালো রান্না করতে পারেন, ভালো খেলাধুলা করতে পারেন- এটি তার সৃজনশীলতা, যোগ্যতা। একজন ব্যবসায়ীও লেখক হতে পারেন। কার লেখার যোগ্যতা আছে আর কার নেই, সেটা সুনির্দিষ্ট করা কঠিন। যে কেউই লিখতে পারে।

আজ সারাবেলা: পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, আপনার একটা বড় জায়গাজুড়ে রয়েছে মনস্তত্ব। কখনো কখনো মনোবৈকল্যও প্রবল। এর কী বিশেষ কোনো কারণ রয়েছে?

মো. সাইফুর রহমান: মানুষের মন বড় বিচিত্র। আমি তা ধরবার চেষ্টা করি। কতটা পারি তা জানি না। সাইকো থ্রিলারের প্রতি আমার আকর্ষণ রয়েছে একথা সত্যি। মনোবৈকল্যের পেছনেও কোন-না-কোন গল্প থাকে। আমি সেই না বলা গল্পগুলোই বলতে চাই হয়তো।

আজ সারাবেলা: আপনি অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। লেখালেখির জন্য প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা জরুরী নাকি লেখকের কল্পনার ডানা-ই যথেষ্ট?

মো. সাইফুর রহমান: লেখকের কল্পনা শক্তি তার লেখনির মূল। এক্ষেত্রে কে কতটা শক্তিমান তার একটা বিষয় থাকে। জে কে রাওলিং তার কল্পনায় কতটা শক্তিমান তা হ্যারিপর্টার পড়লেই বোঝা যায়। অনেকগুলো মুভি হয়েছে শুধুমাত্র তার এই কল্পনা শক্তির প্রখরতায়। কিংবা জুলভার্ন -এর ‘রাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন এইট্টি ডেইজ’ অথবা ‘গালিভার ট্র্যাভেল্স’ নেহাত কল্পনা। কল্পনাই একজন লেখককে আকাশসম উচ্চতায় নিয়ে যায়। তবে লেখবার জন্য অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন।

আজ সারাবেলা: কল্পনা হোক কিংবা বাস্তব, লেখক হিসেবে আপনি কোথায়-কতদূর যেতে চান?

মো. সাইফুর রহমান: আমার কাছে বর্তমানটা গুরুত্বপূর্ণ। পড়াটাকে অনেক জরুরী মনে করি। নিজের চিন্তা, পর্যবেক্ষন সেটাতো থাকেই কিন্তু পাশাপাশি যদি বিশ্বভূগোল না পড়া থাকে তাহলে নিজেকে তৈরী করবো কীভাবে? এখনতো যেকোনো লেখককে গ্লোবালি কম্পিট করতে হয়। এখানে বসেই একজন লেখককে নিকারাগুয়া কিংবা আটলান্টার একজন তরুণের ভাবনাকে স্পর্শ করতে হবে। তা না হলে সবাই সেই লেখককে পড়বে কেন? এখন আর নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে থেকে লেখবার সুযোগ নেই। আঞ্চলিক লেখক অঞ্চলের মধ্যেই বন্দি থাকবেন। এই গন্ডি ভাঙ্গতে হলে তাকেও এসে দাড়াতে হবে জেমস প্যাটারসন, নোরা রবার্টস, নিকোলাস স্পার্কস কিংবা এলিস ওয়াকারের পাশে। এরা প্রত্যেকেই খ্যাতিমান এবং জনপ্রিয়।

আমি শুধুই পড়ছি। সেই ছেলে বেলায় আল-মাহমুদের ‘উপমহাদেশ’ থেকে শুরু করে পাবলো কোয়েলহো’র ‘আলকেমিস্ট’ এখনও আমার কাছে বিস্ময়। মানুষ কি করে এত বিপুল বিস্তারিত জীবন জগৎ নিয়ে লিখে! আমি শুধুই ভাবি, পড়ি। কিছুটা লেখার চেষ্টা করি।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/সাক্ষাৎকার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here