৩ নভেম্বর: আত্নত্যাগ, দেশপ্রেম ও বিশ্বস্ততার নিদর্শন

0
129

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর যে চারজন নেতা-সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান জাতিকে দিক নির্দেশনা দিতেন তাঁদের জাতিয় চারনেতা হিসাবে অভিহিত করা হয়। তাঁদের মধ্যে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রধানতম পুরুষ, যার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের অস্হায়ী বাংলাদেশ সরকার নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে । এই ঘটনাটি বাঙালি জাতিসত্তাকে বিশ্ববাসীর সামনে গর্বিত পুনরুত্থানের সুযোগ করে দেয়।

তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা। একজন সৎ ও মেধাবী রাজনীতিবিদ হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন যা মুজিবনগর সরকার নামে অধিক পরিচিত।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসাবে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মো. মনসুর আলী একজন রাজনৈতিক এবং শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গঠিত বাংলাদেশ সরকারে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন।

এ এইচ এম কামারুজ্জামান বাংলাদেশের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গঠিত অস্থায়ী সরকারের স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। একজন নির্লোভ, সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে তার পরিচিতি ছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নৃশংসভাবে নিহত হলে ঐ সময় জাতিয় চার নেতাকে প্রথমে গৃহবন্দী এবং পরে ২৩শে আগস্ট সামরিক আইনের অধীনে তাঁদের গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী করা হয়৷ কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ভোর সাড়ে চারটায় ঐ চার নেতাকে কিছু সেনা সদস্য নির্মমভাবে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে জেল হত্যা দিবস নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।

শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, সকল আন্দোলন-সংগ্রামে এই চার নেতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকেছেন। বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুকে যখন কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে তখন আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাঁরা এদেশের মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিলেন এবং জাতিকে দিক নির্দেশনা দিতেন। তাঁদের দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রশ্নাতীত ছিল। দেশপ্রেম ছাড়াও আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুকে তাঁরা প্রানের চেয়েও বেশী ভালবাসতেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা সেদিন দেশমাতৃকার সেরা সন্তান এই জাতীয় চার নেতাকে শুধু গুলি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, কাপুরুষের মতো গুলিবিদ্ধ দেহকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে একাত্তরে পরাজয়ের জ্বালা মিটিয়েছিল। বাঙালীকে পিছিয়ে দিয়েছিল প্রগতি-সমৃদ্ধির অগ্রমিছিল থেকে। ইতিহাসের এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশের মানুষই নয়, স্তম্ভিত হয়েছিল সমগ্র বিশ্ব। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড ছিল একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা। বিশ্বাসঘাতক খুনীদের পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য আজ জাতির সামনে পরিষ্কার। মিথ্যা কুয়াশার ধূম্রজাল ছিন্ন করে আজ নতুন সূর্যের আলোকের মতো প্রকাশিত হয়েছে সত্য।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তখন অনেকটা দিশেহারা। চারজন সিনিয়র নেতাসহ অনেকেই কারাগারে এবং অনেকে আত্ন গোপনে ছিলেন। বাকি নেতারা প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্যে নতুন রাস্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের সাথে সমঝোতা করেন। অনেকে আবার রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। এদিকে খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্রকারীরা জাতীয় চার নেতাকে তাদের সরকারে যোগদানের প্রস্তাব দেয়। নানা পদ-পদবী, সুযোগ-সুবিধা, অর্থ-বিত্তের লোভ দেখান কিন্তু কোন কিছুতেই জাতিয় এই চার নেতাকে রাজী করাতে পারেননি বরং তাঁরা সেই প্রস্তাব সমূহকে ঘৃনাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।

জাতীয় এই চার নেতার সেইদিনকার আত্নত্যাগ, তাঁদের দেশপ্রেম ও বিশ্বস্ততা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। সেদিন কোন উপায়ন্তর না দেখে খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বাধীন সরকার তাঁদের হত্যার সিদ্ধান্ত নেন এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁদের হত্যা করেন। ৩রা নভেম্বর জেল হত্যা দিবস এবং বাঙালী জাতি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে তাঁদের প্রিয় নেতাদের যারা আত্নত্যাগ, দেশপ্রেম ও বিশ্বস্ততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মানব ইতিহাসে।

লেখক: সাবেক প্রভোস্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here