আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার দেশরত্ন শেখ হাসিনার আজ ৭৪ তম জন্মদিন

0
307

ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর:
আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৭ সালের ২৮ শে সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা। টুঙ্গিপাড়াতেই বাল্যশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৫৪ সাল থেকে ঢাকায় পরিবারের সাথে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে ওঠেন।শেখ হাসিনা ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট (কিছু বিপথগামী সেনা অফিসার) এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা ছাড়া পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করা হয়।বোনদ্বয় সেই সময় পড়াশোনার জন্য জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

চলতি মেয়াদসহ চারবারের (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০১৪, ২০১৪-২০১৯, ২০১৯-বর্তমান) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে একটি রোল মডেল হিসেবে পরিচিত করেছেন। সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনেও তিনি বিশ্বনেতাদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতায় পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দিয়ে সারা বিশ্বে হয়েছেন প্রশংসিত। শান্তি, শিক্ষা, সম্প্রীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। যা সম্ভব হয়েছে তাঁর দূরদর্শিতা ও দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালবাসার কারণে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নতির পাশাপাশি ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার, পদক, ডক্টরেট ডিগ্রী ও সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসায় বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা, নেত্রীবৃন্দ ও গণমাধ্যম তাঁকে নানা উপাধি দিয়েছেন যেমন- বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী নারী সরকার প্রধান, বিশ্বে সৎ নেতৃত্বের তালিকায় অবস্থান- ৩য়, নারী ক্ষমতায়নে ১৫৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৭ম। এছাড়াও বিভিন্ন উপাধি- মাদার অব হিউম্যানিটি, ক্যারিশম্যাটিক লিডার, লেডি অব ঢাকা, প্রাচ্যের নতুন তারকা, বিশ্বের নেতা, নারী-অধিকারের স্তম্ভ, বিশ্ব শান্তির দূত, মানবিক বিশ্বের প্রধান নেতা, জোয়ান অফ আর্ক, বিশ্ব মানবতার আলোকবর্তিকা, বিশ্ব মানবতার বিবেক, বিরল মানবতাবাদী নেতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

ফোর্বস সাময়িকীর দৃষ্টিতে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০০ নারীর তালিকায় ২০১৮ সালে তাঁর অবস্থান ছিল ২৬ তম এবং ২০১৭ সালে ৩০ তম। টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী ১০০ ব্যাক্তির তালিকায় নাম এসেছে এবং লিডারস ক্যাটাগরিতে ২৭ জনের মধ্যে ২১তম। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ফরেইন পলিসি নামক সাময়িকীর করা বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ১০০ বৈশ্বিক চিন্তাবিদদের তালিকায় শেখ হাসিনা জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি বিশ্বনারী নেত্রী পরিষদ -এর একজন সদস্য, যা বর্তমান ও প্রাক্তন নারী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। অগণিত সম্মাননা, পদক ও ডিগ্রী প্রাপ্তিতে তিনি আলোকিত করেছেন দেশ, জাতি ও বিশ্ব সম্প্রদায়কে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পর এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এতটাই অগোছালো ও কোন্দল ছিল যে দলটি নানা উপদলে বিভক্ত ও নেতৃত্বশূন্য ছিল। তৃনমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত দলের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ, সকলের মধ্যে একটা ধারণা ছিল যে, আওয়ামী লীগের পরিণতি মুসলিম লীগের মতো হবে। তার উপর এই দলটির বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারনা এতোটাই তীব্র ছিল যে, এসবকে প্রতিহত করে রাজনীতির মাঠে নতুনভাবে দাঁড়ানো মোটেও সহজ ছিল না। এর ওপর শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত ও একটি ঘোলাটে সামরিক শক্তি নতুনভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠার সময়ে শেখ হাসিনা দলের হাল ধরলেন, নতুন করে সবকিছু গোছাতে লাগলেন, অভিজ্ঞতাও ছিল কম। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দল চালানো অনেক কঠিন ছিল।

১৯৮১ সালের ১৭ মেদীর্ঘ প্রায় ৬ বছর পর তিনি মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছিলেন কেবল একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে নয়, জাতীয় রাজনীতির হাল ধরতে, সেনা শাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনতে এবং অগোছালো আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্যে। এদিকে, আওয়ামী লীগ ১৯৮১ সালে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন সুসংগঠিত ঠিক আবারও শুরু হয় তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও জীবন নাশের হুমকি। অধিকন্ত পিতার মতো বরাবরই তিনিও ছিলেন ঘাতকের ষড়যন্ত্রের টার্গেট। একবার নয়, দুইবার নয়, শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। তাঁকে এবং আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের এক জনসভায় গ্রেনেড হামলা করা হয়। উক্ত হামলায় ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন এবং নেত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হয়। ঐ হামলায় নিহতের মধ্যে মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমান অন্যতম। বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত নৃশংস সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা তার একটি।

সকল বাধাবিপত্তি ও দেশী-বিদেশী চক্রান্ত উপেক্ষা করে অবশেষে দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের জুন মাসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে। দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্র করে ২০০১-২০০৮ পর্যন্ত ক্ষমতার বাহিরে রাখা হয়। আবারও শুরু হয় দলীয় নেতাকর্মীদের উপর অমানসিক নির্যাতন, হামলা-মামলা, সংখ্যালগুদের উপর হামলা ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড। সারাদেশে ছাত্রদল, জামাত-শিবিরদের তাণ্ডব জাতি দেখেছে নিজ চক্ষে। ২০০৭ সনের ১/১১ এ সেনা শাসিত সরকার আবারও আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করতে চেয়েছে, শেখ হাসিনাসহ অগণিত নেতাকর্মীকে জেলে আটক করেছে, হত্যা, নির্যাতন, হামলা মামলা দিয়েছে কিন্ত কোন কিছুই আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করতে পারেনি উপরন্ত সময়ের সাথে সাথে আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং মানুষের আশ্রয় ও শেষ ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। শত বাধাবিপত্তি, জুলুম, নির্যাতন উপেক্ষা করে ২০০৮ সনে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখাগরিষ্ঠতা পায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। পরবর্তীতে ২০১৩ ও ২০১৮ সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি নিরঙ্কুশ সংখাগরিষ্ঠতা নিয়ে এদেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায় এবং শেখ হাসিনা ৪র্থ বারের মত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

জননেত্রী শেখ হাসিনা এদেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এবং ধাপে ধাপে তার বাস্তবায়ন করছেন। দেশের মানুষ ডিজিটাল বাংলাদেশ, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন, শিক্ষার আধুনিকায়ন ও কর্মমুখী শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও এর আওতা বৃদ্ধি, খেলাধুলায় ব্যাপক উন্নয়ন, দারিদ্র দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা, গড় আয়ু, মাথা পিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি, মেগা প্রকল্পসমুহ ইত্যাদির যেমন স্বপ্ন দেখেছিল ঠিক তেমনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানুষের স্বপ্নের বাস্থবায়ন করেও দেখাচ্ছেন। মুজিববর্ষকে সামনে রেখে দেশে যখন একটা উৎসব মুখর পরিবেশ ঠিক তখনই সুদূর চীনের উহান থেকে সৃষ্ট করোনা ভাইরাস পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মত বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক আঁচার অনুষ্ঠান তথা মানুষের জীবন যাপন ও চাল-চলনে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। বাংলাদেশে ৮ই মার্চ প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর ২৬ মার্চ থেকে পুরোদেশ লকডাউনে যেতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে জাতি ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদযাপন করে যদিও রাষ্ট্রীয়সহ প্রায় সকল অনুষ্ঠান স্থগিত বা সীমিত করা হয়। ২৬ শে মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ করোনা ভাইরাসের সাথে লড়াই করে জীবন যাপন করছে। করোনার পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড় আপ্পানের আঘাত, বন্যার চোখ রাঙ্গানিসহ নানাবিধ প্রকৃতি সৃষ্ট দুর্যোগ এদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ নানা প্রান্তের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানগণ যখন করোনা সংকটে হিমসিম খাচ্ছেন ঠিক তখনই বাংলাদেশের প্রকৃতি সৃষ্ট সংকটের পাশাপাশি করোনা পরিস্থিতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত ধৈর্য ও দক্ষতার সহিত মোকাবিলা করছে।

বার বার মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখা, বাবা-মা, ভাই, আত্মীয় স্বজনের মৃত্যুর শোক নিয়ে বেঁচে থাকা, জেল জুলুম সহ্য করা, অগণিত নেতাকর্মীর দুঃখ কষ্ট ও বিপদে কাছে থাকা নেত্রীর নাম শেখ হাসিনা। অসংখ্য দেশী-বিদেশী সম্মানসূচক পদকে ভূষিত হওয়া এবং বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে সম্মানিত/আলোকিত করা, স্বল্প সময়ে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা তথা এদেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখানো নেত্রীর নাম শেখ হাসিনা।

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার দেশরত্ন শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন এদেশের মানুষের শেষ আশ্রয় জননেত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক: অধ্যাপক ও সাবেক প্রভোস্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here