মহামারী পরিস্থিতিতে টেলিফার্মাসি

0
670
  • আব্দুল কাদের মহিউদ্দিন
    বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাগুলি ব্যয়বহুল জটিলস্বাস্থ্য-চাহিদা সম্পন্ন রোগীদের একটি অল্প অংশের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠছে। এই জটিল রোগীদের একটি বড় অংশ একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছে এবং প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে। বর্তমানে করোনাভাইরাস COVID-19 সারা বিশ্বে ২১২টি দেশকে প্রভাবিত করেছে। এই পরিস্থিতিতে হোম কেয়ার বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ কারণ মহামারী পরিস্থিতি চলাকালীন হাসপাতালগুলি আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ নয়। এছাড়াও লকডাউন পিরিয়ডের সময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগও সীমিত। টেলিমেডিসিন এবং টেলিহেলথ প্রযুক্তিগুলি মহামারী প্রাদুর্ভাবের সময় বিশেষত কার্যকর হয়, বিশেষ করে যখন স্বাস্থ্য আধিকারিকরা সামাজিক দূরত্ব-ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়। টেলিফোন-ভিত্তিক এই পদক্ষেপ উপযুক্ত তথ্য এবং প্রতিক্রিয়া সংযুক্ত করে কার্যকারিতার উন্নতি করছে। স্বাস্থ্যসেবাতে অধিগমন বাড়ানোর পাশাপাশি, টেলিমেডিসিন স্বাস্থ্যসেবা রোগীদের বিভিন্ন সুবিধা প্রদান, জটিল অবস্থায় উপনীত ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নির্ণয় এবং পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করা এবং ব্যয় হ্রাস করার ফলপ্রসূ ও সক্রিয় একটি উপায়।

মহামারী পরিস্থিতিতে ফার্মাসিস্টদের উত্থান আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশে ক্রমবর্ধমানভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকটি চলমান জার্নাল, বই, নিউজলেটার, ম্যাগাজিন ইত্যাদির সাম্প্রতিক প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ডাক্তার ও নার্সদের থেকে ফার্মাসিস্টদের দায়িত্ব, কর্তৃত্ব এবং কর্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন যদিও কিছু মিল রয়েছে। ডাক্তারদের পাশাপাশি ফার্মাসিস্টরা মহামারীর সময় ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যসেবা কর্মী হিসাবে কাজ করতে পারে। এই পেশা উন্নত এবং স্বল্পোন্নত উভয় দেশেই বিকশিত এবং খুব প্রশংশিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ পেশাদার ফার্মাসিস্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এবং আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন (এফআইপি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তাদের মধ্যে প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ রোগী সেবাতেই কাজ করছেন। এমনকি আমেরিকাতেও প্রাথমিক যত্ন প্রদানকারী এবং চিকিত্সা বিশেষজ্ঞের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি ফার্মাসিস্টদের জন্য বিভিন্ন চিকিত্সা পরিসেবায় দীর্ঘস্থায়ী রোগের রোগীদের পরিচর্যার সুযোগ করে দিয়েছে।

যাইহোক, বাংলাদেশে প্রায় একশতটি সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মাসি পড়ানো হয় এবং প্রায় ৮০০০ ফার্মাসি শিক্ষার্থী প্রতি বছর স্নাতক সম্পন্ন করে। বর্তমানে Hospital Pharmacy বিশাল কাজের সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে স্নাতক ফার্মাসিস্টরা রোগী প্রতিপালন, অনুবর্তিতা এবং কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ক্লিনিকাল ফার্মাসি, হাসপাতাল এবং কমিউনিটি কেয়ার ফার্মাসির একজন পেশাদার ফার্মাসিস্ট বা শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট রোগের পরিস্থিতিতে তার করণীয় বিষয়টি নির্ধারণ করতে পারেন। টেলিহেলথ কেয়ারে আমাদের এই ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ দেওয়ার বিশাল সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি কলে একজন ফার্মাসিস্ট সাম্প্রতিক চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে উপযুক্ত এবং মানভিত্তিক উভয় তথ্যই সরবরাহ করতে পারেন। গবেষণায় দেখা যায় যে সঠিক ওষুধ পরিচালনার অভাবে উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, দীর্ঘকালীন হাসপাতালে অবস্থান, অসুস্থতা এবং মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়। অধিকন্তু, জানা গেছে যে প্রতি পাঁচটির মধ্যে একটি হাসপাতালে ভর্তি পোস্ট-ডিজচার্জ জটিলতার সাথে এবং প্রায় সত্তর শতাংশই ওষুধের সঠিক ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত। ২০১৭ সালে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে গুরুতর, এড়ানো যায় এমন ওষুধ-সম্পর্কিত ক্ষতিগুলি কমিয়ে আনার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল।

আমেরিকান জার্নাল অফ হেলথ সিস্টেম ফার্মেসী মতে ক্যালিফোর্নিয়ায় তিনটি কমিউনিটি হাসপাতালে ওষুধ-সম্পর্কিত সমস্যা প্রতিরোধে ফার্মাসিস্টের হস্তক্ষেপ আনুমানিক এক বছরে প্রায় ৮ লক্ষ ডলার ব্যয়-সাশ্রয় করেছিল। অন্য একটি জার্নাল এনালস অফ ফার্মাকোথেরাপি থেকে প্রাপ্ত, নিয়ম অনুযায়ী এবং পরিমানে সঠিক ওষুধ গ্রহণ না হবার কারণে ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী প্রেসক্রিপশন-ওষুধ-সম্পর্কিত অসুস্থতা এবং মৃত্যুর আনুমানিক বার্ষিক ব্যয় ছিল পাঁচ শতাধিক মার্কিন বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও, লেখকরা অনুমান করেছেন যে একই কারণে প্রতি বছর প্রায় দুই লক্ষ পঁচাত্তর হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়। একজন ফার্মাসিস্ট সরল ভাষা এবং নন-মেডিকাল পরিভাষা ব্যবহার করে রোগীদের তথ্যের বোধগম্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সঠিক অনুরোধ দ্বারা প্রেসক্রিপশন পূরণের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। কার্ডিওভাসকুলার এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী অবস্থার সাথে রোগীদের দূর থেকে পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ এবং পরামর্শের জন্য টেলি-ফার্মাসিস্টের কার্যকারিতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে। এছাড়া আচরণগত স্বাস্থ্যের অংশ হিসাবে টেলিহেলথের মাধ্যমে সাইকোথেরাপিও পরিচালিত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এটি বলা যেতে পারে যে, ফার্মাসিস্টরা চিকিৎসা অনুষঙ্গ এবং বিধিবিধান উভয় ক্ষেত্রেই ভূমিকা নিতে পারে। একইভাবে টেলিহেলথকেয়ারে পেশাদারী ফার্মাসিস্ট অপরিহার্য ভূমিকা পালন করতে পারেন যা যথাযত উদ্যোগ এর অভাবে এখনো হয়ে উঠেনি।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং অন্যান্য স্যাটেলাইট চ্যানেল টেলিমেডিসিন জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তাদের এর কার্যকারিতা এবং ব্যয় দক্ষতার সম্পর্কে সম্প্রচার করা উচিত। যাইহোক, নিবন্ধটি মহামারী পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য সহায়তার দুটি বড় বিষয়কে কেন্দ্র করে। প্রথমত, মহামারী পরিস্থিতির সংকট মুহুর্তে টেলিমেডিসিনের গুরুত্ব এবং এই খাতে ফার্মাসিস্টদের বিশ্বাসযোগ্যতা, উভয়ই বাংলাদেশে দৃশ্যত অস্তিত্বহীন। টেলিমেডিসিনে নিয়োগের আগে ফার্মাসিস্টদের জন্য স্ট্রাকচারাল ট্রেনিং প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করা উচিত। এর ব্যবহারিক প্রয়োগ বাংলাদেশের প্রায় সত্তর শতাংশ গ্রামীণ মানুষকে উপকৃত করবে, যাদের স্বাস্থ্যসেবা খুবই সীমিত।

জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সিস্টেমগুলিতে টেলিফার্মাসি সেবার সংহতকরণ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে টেলিফার্মাসি পরিষেবাগুলির সংযোগ (বৈদ্যুতিক ডেটা প্রবেশের ব্যবস্থা, প্রেসক্রিপশন অর্ডার যাচাইকরণ, ওষুধ সরবরাহ ইত্যাদি) এর সংযোগের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা সংক্রান্ত আইন এবং যথাযথ বিধিবিধান স্থাপন আবশ্যক। অন্যান্য পেশাদার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাথে টেলিফার্মাসি পরিষেবাগুলির মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের সুরক্ষা ও সঠিক বিভাজন এই সেক্টরের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। আমরা আশা করি নীতিনির্ধারকরা এর সম্ভাব্যতা সম্পর্কে সচেতন হবেন্ এবং নাগরিক স্বার্থে টেলিফার্মাসি পরিষেবাগুলির বৃহত্তর প্রচারে অবদান রাখবেন্।

লেখক: সেক্রেটারি এন্ড ট্রেজারার, ডক্টর এম. নাসিরুল্লাহ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, তেজগাঁও, ঢাকা।
E-Mail: [email protected]

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/কলাম

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here