স্বাধীনতাবিরোধীদের প্ররোচনায় বন্ধ হলো বঙ্গবন্ধুর প্রচারণা!

শেখ হাসিনা নিজে সরকার প্রধান থাককালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ সংরক্ষনের আদেশটি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

রবিউল ইসলাম রবি: কবি কুমার সুশান্ত সরকারের একটি ও ছড়াকার মৌসুমী মৌ-এর তিনটি গ্রন্থ নিয়ে চলছে লেখক- প্রকাশক পাড়ায় নানা আলোচনা-সমালোচনা। কেউ চাইছে বইগুলো ছড়িয়ে যাক সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, শিক্ষার্থীরা যেন বইগুলো থেকে জানতে পারে স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে। অন্যরা তা চাইছে না। বলছে, এসব বই সারাদেশে যাবার যোগ্য না। অথচ বইগুলো মূল্যায়ণ করেছেন দেশের বরেণ্য কবি সাহিত্যিকগণ। নির্মলেন্দু গুণ, ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কবি অসীম সাহা এবং পশ্চিবঙ্গের কবি সুবোধ সরকারও মূল্যায়ণ করেছে বইগুলো।

অভিযোগ উঠেছে, স্বাধীনতাবিরোধী কতিপয় লোকের মিথ্যা প্ররোচনায় সরকারি আদেশটি বন্ধ করে দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লেখক দীপু মাহমুদ, প্রকাশক সাঈদ বারী, শোভন ইফতেখার শাওন ও আলাউল হোসেন নামের এই ব্যক্তিরা বঙ্গবন্ধু নিয়ে লেখা বইগুলো পড়ে যেন বাংলাদেশের ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে জানতে না পারে তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানারকম মিথ্যা তথ্য দিয়ে লেখালেখি করায় কোনরকম যৌক্তিক কারণ ছাড়াই মৌখিকভাবে সারাদেশে বই পাঠানোর কার্যক্রমটি বন্ধ করে দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।

গত জুলাই মাসে এই চারটি গ্রন্থ যাচাই-বাছাই শেষে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি ও অপারেশন বিভাগের পরিচালক, যুগ্ম সচিব খান মো. নুরুল আমিন সাক্ষরিত একটি দাপ্তরিক চিঠিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কিত কবি কুমার সুশান্ত সরকারের পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত ‘অসাম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ’ প্রবন্ধ গ্রন্থ এবং ছড়াকার মৌসুমী মৌ-এর তিনটি ছড়াগ্রন্থ জিনিয়াস পাবলিকেশন্সের ‘বাংলা ছেড়ে ভাগ’ ও ‘রাম ছাগলের পাঠশালা’ অন্যটি শিশুরাজ্য প্রকাশনার ‘জাগরণ আসবেই’ গ্রন্থগুলো সারাদেশের স্কুল লাইব্রেরীতে সংরক্ষনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের আদেশ দেন।

দপ্তরের এই চিঠির ভিত্তিতে গ্রন্থগুলোর প্রকাশকগণ বই সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করেন। সারাদেশের বই পাঠানোর জন্য নতুন করে অর্থ বিনিয়োগ করে বই ছাপান প্রকাশকরা। ২০ শতাংশ কমিশন দিয়ে ১০টি জেলায় বইও পাঠান তারা। এরই মধ্যে হঠাৎ করে বই পাঠানোর আদেশ স্থগিত করায় জেলাগুলোতে পাঠানো বইয়ের মূল্য না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রকাশকরা।

২০ শতাংশ কমিশন দিয়ে জেলায় পাঠানো বইয়ের রিসিভ কপি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কার্যক্রমটি বন্ধের উষ্কানিদাতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ বজলুল হুদা’র ভাতিজা দীপু মাহমুদ যার পুরো নাম রেজা মাহমুদ আল হুদা অন্যতম। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ঘটনাস্থলে ক্যাপ্টেন বজলুল হুদাকে মেজর পদোন্নতি দিয়েছিলেন মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান। জঘন্যতম এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম হোতা ছিলেন মেজর বজলুল হুদা। হত্যার পর ১৯৯১ সালে এক জনসভায় বজলুল হুদা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবকে আমি নিজের হাতে গুলি করে হত্যা করেছি। কার সাধ্য আছে আমার বিচার করার? এদেশে শেখ মুজিব হত্যার বিচার কোনো দিনই হবে না।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে এই মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। সকল বাধা বিপত্তি শেষে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বজলুল হুদার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

বজলুল হুদার ভাতিজা রেজা মাহমুদ আল হুদা ওরফে দীপু মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সময় সরকারবিরোধী মন্তব্য করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সারাদেশে এই গ্রন্থগুলো প্রচারে বাধা দেওয়ায় সূচিপত্রের প্রকাশক সাঈদ বারীর নামও উঠে এসেছে। বাংলা বাজারে বিএনপি পন্থী প্রকাশক হিসেবে তার ‘বিশেষ পরিচিতি’ রয়েছে। জানা যায়, সাঈদ বারী তার প্রকাশনী থেকে ২০০৯ সালে চাকরিচ্যুত আমলা আবু করিমের লেখা একটি গ্রন্থ বের করে। বইটি বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করে লেখা বলে বাংলা একাডেমি বইটি বিক্রি নিষিদ্ধ করে।

ধ্রুপদ সাহিত্যাঙ্গণ প্রকাশনীর মালিক শোভন ইফতেখার শাওন নামে আরেক প্রকাশকের নামও উঠে এসেছে। বাংলা বাজারে বিএনপিপন্থী প্রকাশক হিসেবে পরিচিতি রয়েছে তার। এমনকি তার পিতা ইফতেখার রসূল জর্জ নওরোজ সাহিত্য সম্ভারের প্রকাশক। শাওনের চাচা এনায়েত রসুল। বাংলা বাজারে বিএনপিপন্থী হিসেবেই লোকের কাছে তিনি পরিচিত।

‘অসম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ’ গ্রন্থটির লেখক কবি কুমার সুশান্ত সরকার বলেন, আমাকে কুরুচিপূর্ণ কিছু লোক যারা কিনা এদেশের জাতির পিতাকে ধারণ করে না; তারা বিভিন্ন মহলে আমাকে ‘অখ্যাত কবি’ বলে সম্মোধন করেছেন। যদি তাই হতো তাহলে প্রথাবিরোধী কবি হিসেবে আমার এত পরিচিতি থাকতো না। আমি ‘প্রথাবিরোধী লেখক সংঘে’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

তিনি আরও বলেন, আমার বিভিন্ন বইয়ে মূল্যায়ণ করেছেন, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, রবীন্দ্রভারতীর উপাচার্য প্রফেসর ড. পবিত্র সরকার, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি অসীম সাহা, ড. প্রফেসর বিশ্বজিৎ ঘোষ, ড. প্রফেসর সৌমিত্র শেখরসহ সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী ও নাট্য ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর। এসব গুণীজনরা যদি একজন কবির বই মূল্যায়ণ করে তাহলে সেই কবি বা লেখক অখ্যাত হয় কিভাবে?

ছড়াকার মৌসুমী মৌ জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্যাঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত। ছোট গল্প, কবিতা এবং ছড়া মিলিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে তার। বর্তমানে তিনি বঙ্গভবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটির সিধান্তে খণ্ডকালীন সংস্কৃতিক শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। ‘কিচিরমিচির’ জাতীয় শিশু সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি।

তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন স্কুলের শিশুদের নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করে আসছেন। বঙ্গবন্ধুর ৯৬ এবং ৯৭তম জন্মোৎসবে শিশু আনন্দ মেলা এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মঞ্চসহ অসংখ্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে আসছেন। তিন বার অগ্রণী ব্যাংক সাংগঠনিক শুভেচ্ছা পদক অর্জন করেছেন তিনি।

তার এই তিনটি বইয়ে নির্মলেন্দু গুণ, ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কবি অসীম সাহা এবং পশ্চিবঙ্গের কবি সুবোধ সরকারও মূল্যায়ণ করেছেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাহলে আমাকে অখ্যাত কবি বা ছড়াকার বলাটা হেয়-প্রতিপন্ন করার সামিল নয়কি?

তিনি আরও জানান, আমার ‘বাংলা ছেড়ে ভাগ’ ছড়াটি রাজাকার ও দেশদ্রোহীদের স্বাধীন বাংলার মাটি থেকে বিতাড়িত করার কথা ছড়া আকারে প্রকাশ করেছেন। আর ‘রামছাগলের পাঠশালা’ ছড়াটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যারা বিকৃত করে সোনার বাংলাকে ধ্বংসযোগ্য পরিনত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। ছড়াটিতে তাদের রামছাগলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই ছড়াদুটি থেকেই বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল এবং শেখ হাসিনা নিজে সরকার প্রধান হিসেবে থাককালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ সংরক্ষনের আদেশটি হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। আদেশটি প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি ও অপারেশন বিভাগের পরিচালক, যুগ্ম সচিব খান মো. নুরুল আমিনের মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/শিল্প-সাহিত্য/শিক্ষা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.