বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস এবং বাংলাদেশে পরিসংখ্যান

ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর: 
অক্টোবর মাসের ২০ তারিখ বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘ পরিসংখ্যান কমিশন তাদের ৪১তম অধিবেশনে (ফেব্র“য়ারি, ২০১০), ২০ অক্টোবর তারিখ বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস পালনের সুপারিশ করে (সুপারিশ নং ৪১/১০৯)। জাতিসংঘ মনে করে একটি দেশের উন্নয়ন সূচক, বিভিন্ন সেক্টর এর নীতিনির্ধারনে, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনে সঠিক ও সময়মত পরিসংখ্যান অপরিহার্য।

এই বিষয়টি বিবেচনায় এনে ৩ জুন ২০১০ সনে জাতিসংঘ তার সাধারণ অধিবেশনে ২০ অক্টোবরকে বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (Resolution A/64/267)। ঐ বছরের ২০ অক্টোবর পৃথিবীতে প্রথম বারের মত বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস পালিত হয় এবং সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনটি উদযাপন করা হবে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সনের ২০ অক্টোবর পৃথিবীব্যাপী অত্যন্ত জাঁকজমক পূর্ণভাবে দিনটি পালিত হয় এবং ২০১৫ সনের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘‘Better Data, Better Lives’’ অর্থ্যাৎ উন্নত পরিসংখ্যান, উন্নত জীবন। যে কোন দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সঠিক ও সময়মত পরিসংখ্যানের ব্যবহার অপরিহার্য।

বাংলাদেশের মত উন্নয়শীল দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রতিটি সেক্টরে নির্ভূল ও সময়মত পরিসংখ্যানের প্রয়োগ খুব দ্রুতই উন্নয়নশীল থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারনে ও প্রকল্প গ্রহণে পরিসংখ্যান চর্চা একটি অতীব জরুরি বিষয়।

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিসংখ্যান চর্চা খুব বেশি দিন আগের নয়। অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন এর একক প্রচেষ্টায় ১৯৪৮ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে প্রথম পসিংখ্যান বিষয়ে পাঠদান শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সনে তাঁরই প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে প্রথম পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় এবং তিনিই ঐ বিভাগের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরের আগ পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশে পরিসংখ্যান চর্চা চলতে থাকে এবং বেশ কয়েকজন দেশ বরেণ্য পরিসংখ্যানবিদের জন্ম হয়।

এদিকে পরিসংখ্যানের সঠিক প্রয়োগ ও ব্যবাহারের লক্ষ্যে ১৯৬৪ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পরসিংখ্যান গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইস্টিটিউট এবং অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন ঐ ইস্টিটিউট এর প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক। অর্থ্যাৎ ড. কাজী মোতাহার স্যারের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সংস্পর্শের কারণে এদেশে পরিসংখ্যান চর্চা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করতে থাকে এবং স্যারকেই বাংলাদেশে পরিসংখ্যান বিদ্যার জনক বলা হয়ে থাকে।

এদিকে অধ্যাপক খন্দকার মনোয়ার হোসেন স্যার ১৯৬১ সনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ১৯৬৮ সালে অধ্যাপক ড. এম. জি মোস্তাফা স্যারের তত্ত্বাবধোনে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগ এবং স্যার ছিলেন উক্ত বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। স্বাধীনতার ঠিক আগে, ১৯৭০ সনে সম্পূর্ণ আবাসিক ধারনা নিয়ে ঢাকার অদুরে প্রতিষ্ঠিত হয় জাহাঙ্গীরনগর মুসলীম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে চারটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু এবং পরিসংখ্যান বিভাগ ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। তখন উক্ত বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক এম. ওবায়দুল্লাহ। এ বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা দেশে ও বিদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন এবং পরিসংখ্যান চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর বাংলাদেশে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুদূরপ্রসারী চিন্তা ধারার ফলশ্রুতিতে ও তার দিক নির্দেশনায় ১৯৭৪ সালের আগষ্ট মাসে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের অধীনে থাকা ৪টি পরিসংখ্যান অফিস (পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের অধীনে পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি মন্ত্রনালয়ের অধীনে কৃষি পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি শুমারি কমিশন এবং স্বরাষ্ট মন্ত্রনালয়ের অধীন আদমশুমারি কমিশন)-কে একীভূত করে সৃষ্টি করা হয় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। ২০০৮ সালে ২৩ টি জেলায় ২৩ টি আঞ্চলিক অফিস করা হয় এবং ৪৮৯ থানা/উপজেলায় অফিস নিয়ে এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে সাধারণ ও বিশেষায়িত মোট ৪০ টি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আছে যার মধ্যে ১৯ টিতে (ঢাকা, রাজশাহী, চট্রগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট; ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া; বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ; বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা; কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা; মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল; পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা; খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা; যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ; হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর; নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী) স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পসিংখ্যান বিষয়ে পাঠদান করা হয়। এই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার পরিসংখ্যান বিষয়ের উচ্চতর ডিগ্রি যেমন এমফিল, পিএইচডি ও অন্যান্য গবেষণারও সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পরিসংখ্যান বিষয়ের পড়াশুনা সন্তোজনক নয়। বর্তমানে ৯৫ টি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একমাত্র ইষ্ট-ওয়েষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশুনার ব্যবস্থা আছে। পরিসংখ্যান বিষয়ের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও অন্যান্য কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ের মুল বিষয়বস্তুর সাথে একটি অথবা দুটি কোর্স সহায়ক কোর্স হিসাবে পাঠদান করানো হয়। নিকট ভবিষ্যতে এসব বিষয়ের মধ্যে পরিসংখ্যানের অধিক সংখ্যক কোর্স সংযোজন করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বেশ কিছু সরকারী ও বেসরকারী কলেজে পরিসংখ্যান বিষয়ে পাঠদান হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা বাড়ানো উচিত। আর্দশ কারিকুলাম ও পাঠদানে সক্ষম অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলীসহ যুগোপযুগি পাঠ্য পুস্তক ও অত্যাধুনিক কম্পিউটিং মেশিন প্রয়োজন।

দেশের সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সঠিক প্রকল্প গ্রহনে পরিসংখ্য্যন বিষয়ের জ্ঞান অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংকে পরিসংখ্যান শাখা, ও অন্যান্য আর্থিক ও বীমা কোম্পানীতে পরিসংখ্যানবিদদের নিয়োগ অতি জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংখ্যা ও কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।

এছাড়া সরকারী ক্যাডারেও পরিসংখ্যানবিদদের সংখ্যা ও মর্যাদা বাড়ানো প্রয়োজন যেন তারা তাদের অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারে এবং দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অংশ গ্রহন করতে পারে। পরিসংখ্যানিক জ্ঞান ও ধারনা কাজে লাগানো এবং নতুন নতুন ধারনার সাথে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের পরিচয় করিয়ে দিতে প্রতি বছর প্রচুর পরিমানে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কসপ, আলোচনা ও গবেষণা লব্ধ তথ্যের আদান প্রদান জরুরি।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আজসারাবেলা/কলাম/রই

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.