বিশ্বাস হয় না, সেই বুয়েটে মানুষ পেটানোর চল হয়েছে!

  • আব্দুন নূর তুষার
    আমার স্কুল ও কলেজের অনেক বন্ধু বুয়েটে পড়েছে। আমার ছোটভাই ও বোন দুজনেই বুয়েট থেকে পড়ে স্থপতি ও প্র্রকৌশলী হয়েছে। আমার বোন বুয়েটের শিক্ষকও হয়েছে।

আমাদের সময়ে বুয়েট নামটাই ছিল বিরাট সন্মানের। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বুয়েট এই দুটো প্রতিষ্ঠান পাশাপাশি। পলাশীর মোড় থেকে বকশীবাজারের মোড় … এই রাস্তাটা ছিল উজ্জল সব মেধাবীদের আনাগোনায় আলোকিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তখন খুব উত্তপ্ত। প্রতিদিন কোন না কোন রাজনৈতিক বিবাদ, কারন সময় ছিল স্বৈরাচারের। এরশাদ তখন ক্ষমতায়, ছাত্ররা কিছুতেই তাকে মেনে নেয় নাই।

পলাশী যাবো কিংবা বকশীবাজার , বললে রিকশাওয়ালারা পয়সা কম নিতো, বাসে মাঝে মাঝে ভাড়া নিতো না। এমনই ছিল সম্মানের নমুনা। দেশে তখন এত মেডিকেল , ইন্জিনিয়ারিং শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নাই। বুয়েটে পরীক্ষা দিতে পারে কেবল ৩০০০ সেরা মেধাবী যাদের অংক ও বিজ্ঞানের নম্বরের সমষ্টি দিয়ে বাছাই করা হয়। পরীক্ষাই দিতে পারেনা অনেকে তাই বুয়েটে পরীক্ষা দিতে পারাটাও একটা অর্জন ছিল যে আপনি বিজ্ঞানএর বিষয়ে দেশের সেরা ৩০০০ এর একজন।

টিউশনিতে বুয়েটের ছাত্র হলে অন্যদের চেয়ে বেশী টাকা দিতেন অভিভাবকেরা। আমাদের সময়তো এত ডিজিটাল ব্যবসা বানিজ্য ছিল না। টিউটরিং ছিল পকেট খরচ তোলার একটা রাস্তা।

আমার বন্ধু গাজী, ওহি, সোহেল , লিটন, মিঠুল, ইকবাল, তনু, আফফান, মামনুন, বাবু , ইফতু, জুলকার, আসিফ, ফয়সাল… সবার নাম লেখা যাচ্ছে না তাহলে অনেক নাম লিখতে হবে… সিনিয়ররা … রাফেল ভাই, ফয়েজ ভাই, মোশতাক ভাই, কবিরুল ভাই, সালেক ভাই, শাফকাত ভাই,মিঠু ভাই, রম্য, মিটুন ভাই ( লেখক আনিসুল হক)… মোজাম্মেল বাবু ভাই আর টিংকু ভাই বন্ধু…. তাই বাবু ভাইও ….

জুনিয়রদেরও চিনতাম, শাগুফতা, বিপা, আরিফ, রানা, বাবর…… অনেক নাম….

বিতর্ক আর ছাত্র রাজনীতির কারনে….

হ্যাঁ, ছাত্র রাজনীতি….

বুয়েটে আর মেডিকেলে সেই রকম ছিল রাজনীতি….

মেধাবীদের রাজনীতি, পরীক্ষার সময় থাকে না…
তবে যখন থাকে তখন সত্যিকারের রাজনীতি হয়
রেজাল্ট যেমন ভালো, রাজনীতিও সেইরকম বুদ্ধির খেলা..

পোস্টার লিখতাম হাতে
বক্তব্য মাইক ছাড়া টুলের উপরে দাড়িয়ে

বুয়েট ক্যান্টিনের আখনি পোলাও…
মেডিকেল আর বুয়েটে একই ঠিকাদার ক্যান্টিন চালাতো কিন্তু আখনি পোলাও দিত বুয়েটে… ৮ টাকা প্লেট…. এটা নিয়ে একটু হতাশা ছিল, ওদেরটা ভার্সিটি আর আমাদেরটা কলেজ…

জিনিষটাকে কেন আখনি বলে সেটা জানতাম না…এখনো জানি না।

বুয়েটের দারুন অডিটোরিয়াম ছিল..
মেডিকেলে ছিল না

দল বেঁধে বুয়েটে যেতাম কনসার্ট দেখতে…

আমি গাজীর সাথে এক সপ্তাহ বুয়েটে ক্লাসও করেছি.. ম্যাথ ক্লাস
স্যারের নাম কুদ্দুস..তাকে বুয়েটে ডাকতো ডেল কুদ্দুস…

বুয়েটের মাঠে ফুটবল খেলেছি, ক্রিকেটও..

শহীদ স্মৃতি হল, রশীদ হল, শেরে বাংলা হলে গিয়ে বন্ধুদের রুমে ঘুমও দিয়েছি। শহীদ স্মৃতি হলটা অন্যরকম ছিল.. লাল ইট, আমাদের হলের কাছে খুব..

বুয়েট আমাদের কাছে খুবই রেসপেক্ট পেত, আমরাও পেতাম….

বুয়েটে ভিপি পদপ্রার্থীরা বিতর্ক করেছিল। এই নিয়ে আমাদের খুব মন খারাপ হয়েছিল, মেডিকেলে কেন আমরা আগে এটা করতে পারি নাই।

আমার ৮৬ ব্যাচের বন্ধুরা আমেরিকায় সম্মিলনী করে, সেখানে আমি গিয়ে তাদের টি শার্ট পড়ে তাদের সাথে আড্ডা দেই, মঞ্চে উঠে কথা বলি… বুয়েটের সাথে আমার এমনি সম্পর্ক….

যেখানে আমার সহোদর ভাই বোন পড়েছে, বন্ধুরা পড়েছে, সেখানে টর্চার সেল? বিশ্বাস হয় না।

বিশ্বাস হয় না, সেখানে মানুষ পেটানোর চল হয়েছে…র‌্যাগ হয়
বড় ভাইয়েরা মারে, অপমান করে, নির্যাতন করে…

১৮ বছরের যে সদ্য কৈশোর পেরুনো ছেলেটি বিরাট স্বপ্ন নিয়ে বুয়েটে আসে তার পাবার কথা বড়দের স্নেহ, পরামর্শ, সাহায্য।

কি বিশাল তার কাছে তার এই অর্জন, বুয়েটের বিশাল বিশাল ভবন, হলের নামকরন, ইতিহাস এসবের গল্প বলে তাকে ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখানোর কথা বড়দের।

সেটা না করে, তারা নাকি রুমে নিয়ে, হলের ছাদে নিয়ে পেটায়…

যে ছেলেটি কোনদিন এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় নাই, তার তীব্র ভীতি ও মানসিক আঘাতের বিষয়টি চিন্তা করলেই আমি কষ্ট পাচ্ছি। এভাবে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেসে একজন ছাত্রের পড়াশোনা থেকে চিরতরে মন উঠে যেতে পারে। সে নিজে এরকম দানবেও পরিনত হতে পারে।

বুয়েটের ডি এস ডাব্লু কি করতো? শিক্ষকেরা? হলের প্রভোস্ট? ভিসি? কেউ কথা বলবে না। দায় তাদেরও নিতে হবে।

কেন এই ভয় দেখানো যায়? পেটানো যায়? কারন এই নেতাদের জনপ্রিয়তা লাগে না। এরা মাফিয়া বড়ভাই, এদের অনুসারীরা স্নেহভাজন না, এরা অনুগ্রহভাজন। তাদের ভোট দরকার নাই। কারো সমর্থন দরকার নাই। তাদের দরকার আজ্ঞাবহ ভৃত্য।

রাজনীতি বন্ধ হচ্ছে কারন সেখানে রাজনীতি ছিলই না। যেটা ছিল সেটা জবরদস্তি। আজকে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথাই হতো না যদি একজন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা বুয়েটে থাকতো।

ছাত্রনেতারা এতই অজনপ্রিয় যে তাদের কারনে রাজনীতিকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের একাংশ।

রাজনীতি না থাকলে নাকি শিবির মাথা চাড়া দেবে, বুয়েটে জংগী হবে, এসব বলা হচ্ছে।

রাজনীতি যে এভাবে পরিত্যাক্ত হচ্ছে এর জন্য কে দায়ী, কারা দায়ী? কাদের বাড়াবাড়ি ও কুকাজের কারনে আজকে এমনটা হচ্ছে।
মারপিট , সন্ত্রাস এগুলোতো দেশের বিপক্ষে যারা তাদের কাজ। কেউ যদি জংগী হয়, সন্ত্রাস করে, নিজের দল যখন ক্ষমতায়, তখন প্রশাসন পুলিশ ডাকবে, স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকান্ড করলে সেটা আইনের শাসন দিয়ে প্রতিহত করা হবে।

অপরাজনীতির জবাব কি অপরাজনীতি?
ক্যান্সারের জবাব কি ক্যান্সার?

এই যে কাজ, যে কারনে বিরাজনীতিকিকরন হলো বা হচ্ছে সেটা কার দায়?

বুয়েট নিয়ে আমার পরিবারের গর্ব আছে। ভাই বোনের কারনে।
আমার নিজের বাড়তি গর্ব আমার আগুনের মতো উত্তপ্ত মেধাবী বন্ধুদের কারনে। এরা সব ইন্টেল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, উবার, এসব জায়ান্টদের বড় বড় কর্তা।

বাংলাদেশের গর্ব আছে বুয়েট নিয়ে.. দেশের প্রযুক্তিজ্ঞান শিক্ষার শুরুই তো হয়েছে এখানে।

সব কেমন যেন শূণ্য হয়ে গেছে।

বুয়েট বললেই ক্রিকেটের স্ট্যাম্প, টর্চার সেল, নির্যাতন, মৃত্যু, নৃশংসতা …মনের মধ্যে পুরোনো শ্রদ্ধাবোধ আর নেই, নামটা ভীতি ও আতংকে পরিনত হচ্ছে।

এরা জানে না… এরা কত বড় ক্ষতি করেছে…

শুধু আবরার না, এরা বুয়েটের রাজনীতিকেও খুন করেছে। বুয়েট এর প্রতি মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধাকেও খুন করেছে। নিজেদের বাবা মায়ের গর্বকে হত্যা করেছে। এরা কেবল আবরারকে না, মেধার প্রতি মানুষের মর্যাদাকে হত্যা করেছে।

এখন কেবল সুবিচারের মাধ্যমেই হয়তো এই ক্ষতকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাময় করা সম্ভব। কিন্তু ক্ষত শুকালেও দাগ থেকে যাবে। সেই দাগ মুছবে কে?

লেখক: চিকিৎসক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

আজসারাবেলা/রই/কলাম

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.