যে বনে মানুষ আত্মহত্যা করতে যায়!

গাছপালায় ঘেরা বন কম বেশি সবারই পছন্দের। কিন্তু সেই বনের ভেতর মানুষ ঘুরতে কিংবা রোমাঞ্চের স্বাদ নিতে যায় না। সেই বনে মানুষ যায় আত্মহত্যা করতে। প্রায় ৩৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা জাপানের একটি বন বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে আত্মহত্যার স্থান হিসেবে।

জাপানের এই বনটির নাম অওকিগাহারা। কেউ কেউ আবার বনটিকে সি অব ট্রিজ অথবা গাছের সমুদ্র বলে। অদ্ভুত পাথর ও কোনো প্রাণের অস্তিত্ব না থাকায় নির্জন এ বন পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়েছে। এর অবস্থান ফুজি পর্বতমালার উত্তর-পশ্চিমে। এই বনে এ পর্যন্ত কত মানুষ মারা গেছে তার সঠিক কোনো হিসেব নেই। তবে ধারণা করা হয়, প্রতি বছর এখানে গড়ে ১০০ মানুষ আত্মহত্যা করেন। আবার এটাও জানা গেছে, আত্মহত্যা করতে আসা অনেকে এই বনে কিছুদিন ক্যাম্প করে থাকেন। এই সময় তারা চিন্তা করেন এখানে আত্মহত্যা করা যাবে কি না।

এই বন থেকে প্রতি বছর শতাধিক মানুষের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ১৯৮৮ সালে এই বনে ৭২ জনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ২০০২ সালে পাওয়া যায় ৭৮ জন। ২০০৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ জনে। ২০০৪ এ গিয়ে দাঁড়ায় ১০৮ জনে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে এই বনে। এর পর থেকে স্থানীয় প্রশাসন মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়।

আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মার্চ মাসের দিকে। আত্মহত্যাকারীদের বেশিরভাগই ফাঁসিতে ঝুলে না হয় মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবনে আত্মহত্যা করে। অওকিগাহারা বনটি আত্মহত্যার জন্য পুরো বিশ্বে দ্বিতীয়।

এই বনে কেন মানুষ আত্মহত্যা করতে আসে তা নিয়ে অনেক ধরনের গল্প চালু আছে। অনেকের মতে, ১৯৬০ সালে সেইকো মাটসুমোটো নামের এক জাপানি লেখকের দুটি উপন্যাস ‘টাওয়ার অফ ওয়েবস’ ও ‘লিট’ প্রকাশের পর থেকেই এই অঞ্চলে এসে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে যায়। এই উপন্যাসের দুটি চরিত্র পরিবার ও সন্তানের শুভ কামনায় এই বনে এসে আত্মহত্যা করেছিল।

ধারণা করা হয়, উপন্যাসের সেই চরিত্র দুটি স্থানীয় মানুষকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তারাও পরিবারের মঙ্গল কামনায় এখানে এসে আত্মহত্যা করেন।

আবার- ঐতিহাসিকদের মতে, উনবিংশ শতাব্দীতে এই এলাকায় ‘উবাসুতে’ নামে এক বিচিত্র রীতি প্রচলিত ছিল। এই রীতি অনুযায়ী মৃত্যু পথযাত্রী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এই জঙ্গলে এসে ছেড়ে চলে যেতেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। এর পর এখানেই মৃত্যু হত তাদের। অনেকের বিশ্বাস, এই জঙ্গলে মৃত ব্যক্তির আত্মারা ঘুরে বেড়ায় । কোনও জীবিত ব্যক্তি এখানে এলে ওই আত্মারাই তাকে আত্মহত্যায় প্রভাবিত করে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যারা এই বনে আত্মহত্যা করতে আসেন তারা মনে করেন এখানে মারা গেলে সফলভাবেই তাদের কাজটি করতে পারেন। কেউ কেউ আবার বলছেন, গণমাধ্যম ও সিনেমাতে এই বনে আত্মহত্যার বিষয়টি এত বেশি প্রচার করার কারণে অনেকে এই বনেই আত্মহত্যা করতে আকৃষ্ট হচ্ছেন।

মানুষ যাতে এই বনে এসে আত্মহত্যা না করে এ কারণে স্থানীয় সরকারের উদ্যোগে বনে ঢোকার মুখে একটা সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। সেখানে লেখা আছে, আত্মহত্যা করার আগে নিজের সন্তান এবং পরিবারের কথা ভাবুন। পিতা-মাতার জন্য আপনার জীবন অমূল্য সম্পদ।

এখানে এসে যাতে কেউ আত্মহত্যা করতে না পারে এ কারণে স্থানীয় প্রশাসন অনেক স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বনে আগতদের আত্মহত্যার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে। বনের প্রবেশ মুখে পুলিশ পাহারাও আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/ফিচার

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.