আমলে নেই স্বাস্থ্য ঝুঁকি, নেই কোন প্রশিক্ষণ 
নিয়ম না মেনেই কীটনাশক ছিটাচ্ছেন বিরামপুরের কৃষকরা

জমিতে স্প্রে মেশিন দিয়ে কীটনাশক স্প্রে করছেন একজন কৃষক। ছবি: প্রতিনিধি

নূরে আলম সিদ্দিকী নূর, বিরামপুর (দিনাজপুর): ‘এলা বিষ গিলে খাইলেও হামার কিচ্চু হবে না, সারাজীবন তো এ্যাংকা করেই (এভাবেই) হারা জমিত বিষ ছিটে আওছি (আসছি)’! মুখে মাস্ক না দিয়ে জমিতে কেন বিষ ছিটাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে খুব সহজ করে এভাবেই কথাগুলো বললেন ষাটোর্ধ বয়সী কৃষক আশরাফুল ইসলাম।

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার বেগমপুর গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম। ওই গ্রামের মাঠের জমিতে তিনি কীটনাশক স্প্রে মেশিন দিয়ে কীটনাশক স্প্রে করছেন। নাকে-মুখে কোনো মাস্ক বা কাপড় নেই। হাতে নেই কোনো হাত মোজা বা গ্লাভস। হাসতে হাসতে তিনি আরও বললেন, ‘হামার গিরামের সবাই তো জমিতে এ্যাংকা করেই বিষ ছিটায়’।

উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা ভর দুপুরে তাদের জমিতে কীটনাশক স্প্রে করছেন। কারও নাকে-মুখে কোনো কাপড় বা মাস্ক নেই। অনেক কৃষককে দেখা গেল তারা টি-শার্ট পরে জমিতে কীটনাশক স্প্রে করছেন। কেউবা আবার ধানের জমিতে সারের সাথে আগাছানাশক মিশিয়ে গ্লাভস ছাড়াই হাত দিয়ে ছিটাচ্ছেন। কীটনাশকের প্যাকেট বা বোতলের গায়ে স্পষ্ট অক্ষরে ‘‘বিষ’’ লেখা থাকলেও তা কেউ আমলেই নিচ্ছেন না। নিয়ম-নীতি না মেনেই এলাকার কৃষকরা যে যার মত করে জমিতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন।

দাউদপুর গ্রামের কৃষক মহাসিন আলী কাজী। তাঁর নিকট জানতে চাওয়া হলো- জমিতে কীটনাশক স্প্রে করার বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে কিনা বা এলাকার ব্লক সুপারভাইজার কীটনাশক প্রয়োগ বিষয়ের উপর কোনো পরামর্শ দেয় কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ‘ত্রিশ বছর থেকে কৃষি কাজ করি, একদিনও তো কোনো অফিসার এসে আমাদের গ্রামে আমাদেরকে কীটনাশক স্প্রে করার ব্যাপারে কোনো প্রশিক্ষণ দেননি বা সতর্ক করেননি’।

কেশবপুর গ্রামের কৃষক আতাউর রহমানকে দেখা গেল তিনি হাফহাতা শার্ট গায়ে দিয়ে জমিতে কীটনাশক স্প্রে করছেন। খালি গায়ে কেন এ কাজ করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে কথা ঘুরিয়ে তিনি বললেন, ‘বাড়িতে গিয়ে সাবান দিয়ে ভালো করে গা ধুইলেই তো সব পরিষ্কার হবে’।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, চলতি বছরে বিরামপুর উপজেলায় প্রায় ১৭ হাজার ৫শত হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান ও ১শত ৭০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরণের (খরিপ-২) সবজি চাষ হচ্ছে। এসব জমিতে আমন ধান ও সবজিকে ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গের হাত থেকে রক্ষা করতে কৃষকরা বিভিন্ন ধরণের কীটনাশক ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ‘‘সুষম তরল সার’’ জাতীয় পিজিআর ভিটামিন ও হরমোন স্প্রে করছেন।

কাটলা বাজারের কীটনাশকের খুচরা বিক্রেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বিভিন্ন কীটনাশক পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানী আমাদের যখন প্রশিক্ষণ দেন তখন তারা আমাদেরকে জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করার সময় নাকে-মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লাভস ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আর সেই পরামর্শগুলোই কীটনাশক বিক্রয়ের সময় আমি সাধারণ কৃষকদের দিয়ে থাকি’।

কীটনাশক স্প্রে করার সময় কোনো প্রকার খাবার গ্রহণ বা ধুমপান থেকে বিরত থাকার কথা কীটনাশকের প্যাকেটের গায়ে থাকলেও খানপুর ইউনিয়নের বাগলপাড়া গ্রামের মাঠে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। কৃষক আফতাব উদ্দিন। তিনি তাঁর ধানের জমিতে কীটনাশক স্প্রে করা অবস্থায় ধুমপান করছেন।

কীটনাশকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লাভস ব্যবহার না করে কেউ কীটনাশক স্প্রে করলে তিনি বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। ওই ব্যক্তির শরীরে কীটনাশকের বেশকিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দিতে পারে। কীটনাশকে আক্রান্ত ব্যক্তির মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরানো, বমিবমি ভাব, চর্মরোগ, চোখ ও শরীরে এলার্র্জি, শ্বাসকষ্ট এমন কি ফুসফুসে বড় ধরণের রোগও হতে পারে।

এ ব্যাপারে বিরামপুর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নিকছন চন্দ্র পাল বলেন, ‘কৃষকদেরকে উপজেলায় ডেকে এনে প্রশিক্ষণ দেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ.সহ. কৃষি অফিসারগণ মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে কৃষকদেরকে জমিতে কীটনাশক প্রয়োগের সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে নিয়মিত পরামর্শ দেন। কৃষি অফিসে জনবল কম থাকায় এ সমস্যা সমাধানে আরও সময় লাগবে’।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/সারাদেশ

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.