আসলামের দিন কাটে খেজুর গাছে, রাত বারান্দায়

সারাবেলা রিপোর্টঃ নওগাঁর রানীনগর উপজেলায় ২০ বছর ধরে শিকল বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন আসলাম হোসেন সাকিদার (৩৮)। মানসিক ভারসাম্যহীন বলে তার পরিবারের লোকজন পায়ে শিকল বেঁধে রেখেছেন। আসলাম উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের হরিশপুর গ্রামের মুনি সাকিদারের ছেলে। পাঁচ বোন তিন ভাইয়ের মধ্যে আসলাম সবার ছোট।

জানা গেছে, ১৯৯১ সলে হরিশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাস করে আতাইকুলা জনকল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ৭ম শ্রেণিতে লেখাপড়া চলা অবস্থায় ১৯৯৫ সালে পরিবারের লোকজন আসলামের চলাফেরার গতিবিধিসহ অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখেন। এ কারণে তার বাবা-মা চিকিৎসার জন্য এলাকার বিভিন্ন কবিরাজের কাছে যান। জিনে ধরেছে এমন অপবাদ দিয়ে কবিরাজরা আসলামের পরিবার থেকে মোটা টাকা নিয়ে অপচিকিৎসা দেয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। একপর্যায়ে আসলামকে পরিবারের সদস্যরা তাকে শিকলে বেঁধে রাখে।

নওগাঁ শহরের পার-নওগাঁ মহল্লার বকুল রহমান নামের এক কথিত মানসিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হন আসলামের পরিবার। প্রায় তিন বছর চিকিৎসা শেষে আসলাম কিছুটা সুস্থ হয় বলে চিকিৎসক দাবি করেন। ১৯৯৯ সালে চিকিৎসক তাকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। এরপর স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতো আসলাম। উপজেলার আতাইকুলা গ্রামের মুনির উদ্দিনের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বিয়ের পর শাওন নামের একটি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। শাওনের বর্তমানে বয়স ১০ বছর। এর কিছুদিন পরই এলোমেলো হয়ে যায় আসলামের জীবন। পরিবারের লোকজন আসলামের মধ্যে পূর্বের ন্যায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখতে শুরু করে।

মধ্যবিত্ত পরিবারে পক্ষ থেকে আর্থিক অনটনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা করতে না পারায় তার উন্মাদনা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। এতে তার বাবা-ভাই মিলে তাকে শিকলে বেঁধে রাখতে বাধ্য হয়। সেই তখন থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে শিকলে বন্দি আসলাম। পরিবারের লোকজন দিনের বেলায় বাড়ির পাশে একটি খেজুর গাছের সঙ্গে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে। রাতে তার জায়গা হয় বাড়ির বারান্দায়।

আসলামের বড় ভাই মেছের আলী, ভাবি শিউলী বেগম বলেন, তাকে সুস্থ করতে পারিবারিকভাবে আমরা সামর্থ অনুযায়ী অনেক টাকা খরচ করে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেছি। কিন্তু ভাইকে ভালো করতে পারিনি। পাবনা মানসিক হাসপাতাল অথবা ঢাকাতে নিতে পারলে হয়তো ভালো হবার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আমাদের মতো ছোট পরিবারের পক্ষে টাকা খরচ করার সামর্থ না থাকায় আমার ছোট ভাইয়ের চিকিৎসার আশা ছেড়ে দিয়েছি।

রানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার ইখতেখায়রুল আলম খান বলেন, এই ধরনের রোগীদের খুব ভালো চিকিৎসার প্রয়োজন। বিশেষ করে পাবনা মানসিক হাসপাতাল কিংবা ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারলে তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রানীনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আল মামুন বলেন, বিষয়টি জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

আজ সারাবেলা/সংবাদ/সাআ/ফিচার

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.