শুধু বলছি, ফার্স্ট হও, একটিবারও বলছি না, ভালো মানুষ হও: ড. আবু ইউসুফ এম আব্দুল্লাহ

ড. আবু ইউসুফ এম আব্দুল্লাহ চেয়ারম্যান, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ট্রাষ্ট। উপাচার্য, নর্দান ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস এন্ড টেকনোলজি, খুলনা। খ্যাতিমান এই শিক্ষাবিদ সম্প্রতি শিক্ষা গবেষণার জন্য পেয়েছেন আন্তর্জাতিক ‘এমটিসি গ্লোবাল এওয়ার্ড এক্সিলেন্স ইন এডুকেশন’ পুরস্কার। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাও তিনি। আলোকিত মানুষ তৈরির কারিগর ড.ইউসুফ আব্দুল্লাহ মুখোমুখি হয়েছিলেন আজ সারাবেলার। শিক্ষার সঙ্কট-উত্তোরণ, নৈতিকতা আর আগামী দিনের বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদের কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জব্বার হোসেনসিদ্দিক আশিক

ক্যাফে আছে, পার্লার আছে, জিমনেশিয়াম আছে কিন্তু কোথাও ভালো লাইব্রেরী নেই, খেলার মাঠ নেই তাহলে কিশোর-তরুণদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ ঘটবে কী করে? আমরা তো ভোগবাদিতার হা-মুখ-গহ্বরে বিলীন হতে চলেছি। শুধু নিতে জানি, দিতে জানি না। নৈতিক শিক্ষার চরম অভাব। দিবারাত্রি মিথ্যা বলছি, সর্বত্র ভেজাল দিচ্ছি, অসততা সর্বদাই। তাহলে আমাদের সন্তানরা নৈতিক ও মানবিকভাবে বেড়ে উঠবে কিভাবে? শিখবে কোথা থেকে? আমরা শুধু বলছি, ফার্স্ট হও, বেশি বেতনের চাকরি পাও। কিন্তু একটিবারও বলছি না, তুমি ভালো মানুষ হও। মানুষ সম্মান করে ভালো মানুষকেই- বলছিলেন শিক্ষাবিদ, নর্দান ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস এন্ড টেকনোলজি, খুলনা’র উপাচার্য প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ এম আব্দুল্লাহ।

আজ সারাবেলা’র সঙ্গে শিক্ষা ও সামাজিক সঙ্কট নিয়ে আলাপচারিতায় তিনি সামাজিক সঙ্কট মোকাবেলায় নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বকেই প্রধান বলে মনে করেন। তিনি বলেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষাই মানুষকে বড় মানুষ হিসেবে তৈরি করতে পারে না। নৈতিক শিক্ষাই পারে মানুষকে মহৎ ও মহান করে গড়ে তুলতে। সে কারণে শিক্ষায় নীতিবোধের বিষয়টি অপরিহার্য।

গবেষণাধর্মী বই ‘ভারত ও বাংলা ভাগ’ এর প্রকাশনা উৎসবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও বইটির লেখক ড. আবু ইউসুফ এম আব্দুল্লাহ।

ড. আব্দুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা গবেষণা, উচ্চ শিক্ষার বিস্তার ও উন্নয়নের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। গড়ে তুলেছেন একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উচ্চ শিক্ষার প্রসারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এখন অপরিসীম। তারা সত্যিই ভালো করছে। গুণগত মান, জবাবদিহিতা, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ততা সকল অর্থেই তারা এগিয়ে। আমি নিজে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত অনেককাল। সে অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আইবিএ’র ছাত্রদের সঙ্গে সমানে সমান প্রতিযোগিতা করতে সামর্থবান। যেটা অনেক সময় খুলনা বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। এটা মানতে হবে। এটা বাস্তবতা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যে সনাতন ধ্যান-ধারণা নিয়ে আছে এটা এখন গ্লোবালি অনেকটা অচল। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে শ্রেণীকক্ষে ফিরতে হবে, আরো বেশি গবেষণা করতে হবে এবং মান উন্নত করতে হবে। তা না হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দিন দিন আরও পিছিয়ে যেতে থাকবে।

শিক্ষা ও চাকরির বাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন ছেলেমেয়েরা খুব স্মার্ট। তাদের চোখ-কান খোলা। তারা পার্থক্যটা করতে পারে। কোন ভেলকিবাজি দিয়ে আপনি তাদের ঠকাতে পারবেন না। ফলে যেখানে শিক্ষার মান ভালো, উচ্চতর গবেষণা আছে, জবাবদিহিতা আছে সেটাই টিকে থাকবে। টিকে থাকছে। অন্য সব ঝরে যাচ্ছে। মার্কেট ইকোনমির চরিত্রই এটা। অযোগ্যরা ঝরে যাবে। যোগ্যরাই টিকে থাকবে।

তিনি আরো বলেন, এখন স্পেশালাইজেশনের যুগ। সবক্ষেত্রে স্কিলড লোক প্রয়োজন। এমন নয় যে একজন লোক একই সাথে একাউন্টিং, ফাইন্যান্স, মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং এ কাজ করবে। যে ব্র্যান্ডিং দেখবে তার শুধু ব্র্যান্ডিং এর উপর স্পেশালাইজেশন থাকতে হবে। ব্র্যান্ডিং এর সঙ্গে মার্কেট এবং ডিমান্ডের বিষয়গুলো ভাবতে হবে। এখন চাকরির বাজার যেমন সুনির্দিষ্ট লোক চায় আপনাকে সেভাবেই স্কিলড করে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে হবে।

শিক্ষাখাতের বাজেটকে তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। বলেন, মানুষের সকল স্বপ্ন তার সন্তানকে ঘিরে। ফলে সন্তানের শিক্ষায় কোন অভিভাবকই চান না কোন কমতি হোক। কারণ শিক্ষাই তাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। সে কারণে শিক্ষায় বিনিয়োগে কোন কম্প্রোমাইজ নয়, যেমন কম্প্রোমাইজ করা যাবে না সন্তানের ক্ষেত্রে। একটা জাতির জন্য, জাতি গঠনের জন্য, বেষ্ট ইনভেস্টমেন্টের জায়গাই হল এডুকেশন। এবং সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে এর লাভটাও বেশি অনেক।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি অনুদান পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের আইন ও নিয়মে চলে। ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারারকে নিয়োগ দেয় স্বয়ং রাষ্ট্রপতি। সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় ইউজিসি ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। সরকার ও রাষ্ট্রের স্বার্থেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে। কিন্তু সে অর্থে তারা কোন ফান্ড বা অনুদান পায় না। ছাত্ররাও নিজেদের অসহায় মনে করে। আমি বলব, সরকার উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে লাইব্রেরী, ল্যাব, রিসার্চে অনুদান প্রদান করতে পারে। বৃত্তি প্রদান করতে পারে। অন্তত প্রতিবছর ৫শ তরুণ শিক্ষক সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় যেন পিএইচডি করতে পারে সেই সুযোগ থাকা উচিত। এটা জাতির এগিয়ে যাওয়ার জন্য, রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/সাক্ষাৎকার/শিক্ষা

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.