কর্ণফুলীতে ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে দুই তরুণের ১৮ বছর পথচলা

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম: জাগতিক নিয়মে বেশির ভাগ মানুষ নিজ নিজ কর্মব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। শিশু কিশোরদের জীবন ও শারিরিক শক্তি এবং মানসিক চিন্তা চেতনায় বুদ্ধিমত্তা বিকাশের জন্য কেউ না ভাবলেও এগিয়ে এসেছেন কর্ণফুলীর দুজন তরুণ যুবক। যারা কিশোরদের নিয়ে ১৮ বছর ধরে বন্ধুর পথে হাঁটছে।

কর্ণফুলী উপজেলার খোয়াজনগর এলাকার কর্ণফুলী উপজেলা ক্রিকেট একাডেমীর চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ পাটোয়ারী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সালাহ্ উদ্দীন আহমেদ। প্রাত্যহিক জীবনের পাশাপাশি শিশু কিশোরদের লেখাপড়ার ফাঁকে বিভিন্ন রকমের খেলাধুলায় আকৃষ্ট করতে তাদের চেষ্টা। মনস্তাত্তিক পরিবর্তনে মাদক থেকে কিশোরদের দুরে রাখাতেই তারা সংগ্রাম করে চলেছেন।

বর্তমানে কর্ণফুলীতে শিশু কিশোরদের মাঝে ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে তারা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। ডিজিটাল যুগে শিশু কিশোরদের অধিকাংশ স্কুল কলেজ শেষে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় থাকে কিংবা প্রযুক্তি পণ্যে ব্যবহার করে সময় কাটায় ।

অনেক কোমলমতি শিশু-কিশোর খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মাদকের দিকে ঝুঁকে পরছে। মাদকে আসক্ত না হয়ে তারা যেন লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায় মননিবেশ করে নিজেদের শারিরিকভাবে সুস্থ্য ও মেধাবিকাশে মনোযোগী হতে পারে। সেই লক্ষে
হারুনুর রশিদ পাটোয়ারী ও সালাহ্ উদ্দীন আহমেদ এর মতো দুই তরুণের চেষ্টা আর সংগ্রাম চলছেই। তারা চায় শিশু-কিশোররা যেন নানামুখী খেলাধুরার মাধ্যমে আনন্দ খুঁজে পায়। অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে কর্ণফুলী উপজেলা ক্রিকেট একাডেমীর মাধ্যমে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও শিশু-কিশোরদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মানে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

খেলাধুলা করার ফলে শিশু কিশোরদের দৈহিক ও মনগত চিন্তায় পরিবর্তন আসে এটাই বিশ্বাস করেন এই দুই যুবক। কর্ণফুলী এলাকার শিশু কিশোরদের মাঝে খুঁজে চলেছেন আগামী দিনের তামিম, শাকিব আর মেসিদের। প্রতিভা থাকলে চর্চার মাধ্যমেই সেটা জ্বলে উঠবে এটাই তাদের বিশ্বাস।

কর্ণফুলী উপজেলা ক্রিকেট একাডেমীর চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ পাটোয়ারী বলেন, খেলাধুলা করার ফলে শিশু-কিশোরদের মনে দলবদ্ধ ভাবে কাজ করার মনমানসিকতা তৈরি হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি যদি পর্যাপ্ত খেলাধুলা করে তাহলে প্রত্যেকের মানসিক চিন্তার বিকাশ সাধন হবে। খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমেই শিশুর ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা জাগিয়ে তোলা সম্ভব।

অন্যদিকে একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও অন্যতম কর্ণধার সালাহ্ উদ্দীন আহমেদ বলেন, শিশুদের কচি মনে হাজারো স্বপ্ন ও হাজারো গল্পের বুনন। হাজারো স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে পড়ালেখার চাপ আর মাঠশূণ্য নগর জীবনে। অধিকাংশ এলাকায় মাঠ বলতে নেই। যদিও কর্ণফুলীতে একটি মিনি স্টেডিয়ামের বড় প্রয়োজন। কেননা দিন দিন খেলার মাঠ, খোলা জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে কিংবা বেদখল হয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী মহলের কারণে।

তিনি আরো বলেন, মাঠ কিংবা খোলা জায়গার অভাবে শিশু কিশোরেরা পারছে না খেলাধুলা করতে অথচ খেলাধুলা চিত্তবিনোদন আর আনন্দের খোরাক। চিত্তবিনোদন শূণ্যতায় অল্প বয়সেই অনেকে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি আগামী বাংলাদেশ তাদের হাতেই যাবে যারা আজ শিশু কিশোর আর তরুণ। সুতরাং এদের মাদকের পথ থেকে সরাতে হবে এর কোন বিকল্প নেই। অপরদিকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই নির্মিত হচ্ছে ভবন ফলে শিশুরা পাচ্ছে না এক টুকরো সবুজ ঘাসের মাঠ।

শিশু কিশোরদেরকে খেলাধুলায় আগ্রহী করে তুলতে প্রয়োজন বিভিন্ন স্কুল কলেজে আন্তঃপ্রতিযোগিতা। এই সব প্রতিযোগিতা থেকেই বেরিয়ে আসবে আগামী দিনের মাশরাফি, জাদুঘর সামাদ, মোনেম মুন্না, মুমিনুল আর মুশফিকেরা। এ জন্য খেলাধুলার মাধ্যমে শিশু কিশোরদের মানসিক পরিবর্তনে কার্যকরী ভূমিকা রেখে চলেছেন তারুণ্যনির্ভর প্রতিভা, অদম্য ক্রীড়া সংগঠক হারুনুর রশীদ পাটোয়ারী ও সালাহ্ উদ্দীন আহমেদ।

ছোট্ট শিশুদের হাতে নানা পুরস্কার ও মুখে হাসি ফোটাতে গেলে অনেকের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। শিশু কিশোরদের জন্য সহজে কেহ এগিয়ে না আসলেও অনেকে আবার স্বেচ্ছায় হাত বাড়িয়ে দেয়। এমন কিছু মানুষের সার্বিক সহযোগিতা আর কষ্টের ফলে আমরা এগোতে পারছি। যোগ করেন হারুনুর রশীদ পাটোয়ারী।

ক্রিকেট একটি ব্যয় বহুল খেলা। বর্তমানে একটা ক্রিকেট ব্যাটের দাম মধ্যবিত্ত কোন চাকরিজীবির এক মাসের বেতনের সমান। যার ব্যয়ভার বহন করতে হিমশিম খেতে হয় কর্ণফুলী উপজেলা ক্রিকেট একাডেমীর।

বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন মাঠ ব্যবস্থার উন্নতি ও শিশু কিশোর আর তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। তাহলেই এগিয়ে যাবে কোটি কোটি লোকের প্রিয় বাংলাদেশ।

পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে বাৎসরিক ভাবে গ্রামীণ ক্রীড়ার আয়োজন করে বিভিন্ন সংগঠন। কখনও সরকারি উদ্যোগে কখনও বেসরকারি পৃষ্টপোষকতায়। কিন্ত দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে সেরকম কোন উদ্যোগ না থাকায় হারিয়ে যাচ্ছে পুরনো সব খেলা। সারাদেশের মতো কর্ণফুলীতে একই অবস্থা বিরাজ করছে। গুটিকয়েক হারুনুর রশীদ পাটোয়ারী ও সালাহ্ উদ্দীন আহমেদ এর মতো তরুণ ক্রীড়া সংগঠক এগিয়ে আসলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৪ সালে হারুনুর রশীদ পাটোয়ারী খোয়াজনগর ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (কেকেএসপি) এর মাধ্যমে ক্রীড়াঙ্গনে প্রবেশ করেন। বর্তমান স্বর্নালী গ্রুপের এমডি কামাল উদ্দিন আহাম্মেদ-এর হাত ধরে। কিশোর বয়সেই তিনি ওই ক্লাবের প্রথম ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে দুজনই ইছানগরের সবুজ সংঘ ক্লাবের হয়ে মহানগর ক্রীড়া সংস্থার ইস্পাহানি পাইওনিওর ফুটবল টুনার্মেন্টে জেলা পর্যায়ে খেলা শুরু করেন। ২০০১ সালে পুনরায় একই টুর্নামেন্ট সাইফুদ্দিন মানিকের হাত ধরে কালারপুল ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ হয়ে অংশগ্রহণ করেন।

সমাজের নানা অপরাধ থেকে সাধারণ ছেলেদের মুক্ত করতে নিজের চাচা মরহুম পেয়ার আহাম্মেদ মেম্বারের হাতে গড়া সংগঠন ইয়াং টাইগার ক্লাবের দায়িত্ব নেন, সমাজের কিছু যুবকদের নিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চারকণ্ঠী হয়ে প্রতিবাদ করেন, একই বছর ২০০১ সালে সাহাব উদ্দিন লন্ডনি ওনার মায়ের নামে নেছা ফাউন্ডেশন এর মাধ্যমে ক্রিকেটে নতুন যাত্রা তৈরি করেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন চরপাথরঘাটার সাবেক সফল ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এম মঈন উদ্দীন ও বর্তমান উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সেলিম হক।

কোচ হিসাবে ছিলেন সাইফুল্লাহ চৌধুরী এবং সর্বোপরি তাদের কে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন বর্তমান কর্ণফুলীর আরেক বর্ষিয়ান নেতা চট্রগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ইসলাম আহাম্মেদ।

২০০২ সালে সেই ক্রিকেট একাডেমির হাল ধরেন সালাউদ্দিন আহমেদ চেয়ারম্যান ও হারুনুর রশীদ পাটোয়ারী কো চেয়ারম্যান হিসেবে। যা ২০০২ সালে শুধুমাত্র ক্রিকেট নিয়ে চিন্তা করে গঠিত হয় কর্ণফুলী ক্রিকেট একাডেমি। যে একাডেমীতে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০জন কিশোর খেলোয়াড় নিয়মিত অংশগ্রহণ করছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বহু ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে যাচ্ছেন।

দীর্ঘ পথচলার সুবাদে খেলোয়াড়দের আরো উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা মাথা রেখে হারুনুর রশীদ পাটোয়ারী ২০১৫ সিজেকেএস কাউন্সিলর আলমগীর কবির ও বর্তমান কর্নফুলী ক্লাবের স্বতাধিকারী রাশেদুর রহমান মিলন এর সহযোগিতায় চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর হিসাবে নিয়োজিত হন। একই বছর দক্ষিণ চট্টগ্রামের আর এক ক্রীড়া সংগঠন কালারপোল ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসাবে নিযুক্ত হন। তাদের হাত ধরেই ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুনার্মেন্টে চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন একাদশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

খেলার প্রতি তাদের আগ্রহ দেখে চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব এম নুরুন্নবী একটা রুমের ব্যবস্থা করে দেন। যাতে খেলোয়াড়রা তাদের খেলার সরঞ্জামাদি রাখা যায়।

আজসারাবেলা/সংবাদ/রই/সারাদেশ

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.